একটি দিনের ক্যানভাস

(প্রিয় পাঠক, এই গল্পটি আগের লেখা। খুঁজে পেলাম কম্পিউটারে। গল্পটি খুব ভালো নয়। কিন্তু আমার ব্লগে আমি লিখলাম। কোন প্রুফরিডিং বা সম্পাদনা ছাড়া। কোন যায় আসে না।)

একশ পচাত্তর টাকা গাড়ীর ব্লুবুকের ভিতর থেকে বের করল আমিনুল। আমিনুল একজন ট্রাফিক সার্জন। সে দাড়িয়ে আছে ফার্মগেইট পুলিশ বক্সের সামনে। তার হাতের ওয়ারলেস থেকে পি পি আওয়াজ বের হচ্ছে, কিছু একটা গোলযোগ ধরেছে তাতে। খুব নির্বিকার ভাবে জিজ্ঞেস করল

-বাকী পচিশ টাকা কই?

সামনে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটি মিইয়ে যায়। তার চোখ জীবন্ত হয়ে ওঠে তাতে প্রকাশ পায় রাজ্যের কাকুতি মিনতি।

-স্যার আজকে আরো এক জায়গায় ধরা খাইছি। আর টাকা নাই (ছেলেটির চোখ ছল ছল করে ওঠে)।

আমিনুল চেহারায় রাগী রাগী একটা ভাব নিয়ে আসে।

-তোদের তো নতুন এই গান, ধরলেই হয় টাকা কম নয়তো আর একজায়গায় ধরা খাইছি। সমস্যা কি?আমিনুল বলে।

-স্যার যা আছে রাইখ্যা দেন, আর একদিন হইব’ ছেলেটি উত্তর দেয়।

আমিনুল ছেলেটির গালে সজোড়ে একটা চর মারে এবং সেই সাথে টাকাটাও পকেটে ভরে ফেলে। তার মেজাজ আস্তে আস্তে বিগড়ে যাচ্চে। এখনও লাইনের মনসুর মিয়া আসে নাই। মনসুর না আসলে তো তার অনেক সমস্যা হবে। নিজে গিয়ে গাড়ী থামিয়ে টাকা নেয় খুব খারাপ দেখাচ্ছে। সামনে ঈদ। অনেক খরচার ব্যাপার। এখন যদি মনসুর এমন করে তাহলে তো মাঠে মারা। নিজের মোটর সাইকেলের উপর বসে আপন মনে সিগারেট টানতে থাকে আমিনুল। বেলা গড়াতে থাকে। এদিকে আকাশের অবস্থাও খুব সুবিধার না। রাত্রে মনে হয় ভালো বৃষ্টি নামবে।

ঢাকা শহরের ট্রাফিক সার্জনদের উপরি টাকা নেয়ার ঘটনা সবার জানা। যেসব গাড়ী রাস্তায় চলে তার অধিকাংশের কাগজপত্র থাকে গোলমালের। সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে পকেট ভর্তি হয় সার্জনের। আর গাড়ি কর্তৃপক্ষ মামলার হাত থেকে বাঁচার জন্য দুইশ টাকা দিতে কার্পণ্য করে না।

গলায় কড়া লাল রঙের একটা মাফলার জড়ায়ে মনসুর রাস্তা পার হচ্ছে। চোখে তার একটা রঙিন রোদ চশমাও দেখা যাচ্ছে। আমিনুল তার সমস্ত গতিবিধি লক্ষ্য করছে। যেমন তার বা পায়ের স্যান্ডেলের একটা ফিতা নাই। তাই খুব কায়দা করে তাকে হাটতে হচ্ছে। আমিনুল এসব খুটিয়ে লক্ষ্য করতে গিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল ভঙ্গ করা একটা রাইডার্সকে সে ধরতে পারল না। এমনিতেই তার মেজাজ খারাপ এবং এবার তাতে বাড়তি যোগ হলো এই ফসকে যাওয়া গাড়ি। মনসুর পাশে এসে দাড়াল। তার মুখ থেকে জর্দার গন্ধ আসছে। আমিনুল এই জর্দার নামও জানে। হাকিমপুরি। লালটি দাঁত নিয়ে মনসুর সামনে দাড়ায়।

-ছালাম ছার। ছারের শইলডা কি ভালা?

মনসুর মিয়ার মুখের বিস্তৃতি হয় অনেক অংশে।

-তোমারে আমি ২৩০ টাকা দিয়া যে ঘড়িটা কিনা দিছিলাম সেই ঘড়িটা কই? আমিনুল বাঁকাভাবে জবাব দেয়।

-আমার ছোড পোলায় ওইডা নিছে, তাই আমার হাতে নাই।’ মনসুরের সহজ স্বীকারোক্তি। -তোমার এইটা কি আসার সময় হলো? আমি তোমারে নিয়া আর পারতেছি না। নাকি আমি খালেকরে কাম দিয়া দিব? খালেক তো এমন করত না। সে আমারটা খুব ভালোই দেখত।’ আমিনুল খিস্তে উঠে।

মনসুর চেহারায় কমনীয়তার উপস্থিতি নিয়ে আসে।

-খালেকরে কাম দিয়া দিলে তো আর আমি কিছু কইতে পারুম না তয় কিনা আপনেরো একটু বিবেচনা করতে হবে। আমারো তো জীবন আছে!’ মনসুর বলে।

-তোমারও জীবন আছে আমারও জীবন আছে। সামনে ঈদ ওই চিন্তাটা কি তোমার মাথায় আছে। অনেক টাকার দরকার এখন আর তুমি কিনা আসো দেরি করে।’ আমিনুল বলে।

-ঠিক আছে ছার, আর দেরি হইব না। ওই যে বাসডা খারাইছে, ওইটারে আগে ধরেন’ মনসুর কথাটা উচ্চারন করেই রাস্তার পাশে দাড়ানো পানের দোকানের কাছে দাড়ায়। আমিনুল বাসটির দিকে এগিয়ে যায়। এবং গাড়ীর ব্লুবুক বের করে আনে।

মনসুর থাকে মিরপুরে। একটা নির্মানাধীন বাড়ির নীচ তলায়। বাড়িটা তার দূর সম্পর্কের মামার। মামা পুরা পরিবার নিয়ে থাকেন জার্মানিতে। মনসুর একাধারে বাড়ির কেয়ারটেকার এবং দারোয়ান। আর যে সময়টা তার বাইরে কাটে সেই সময়ে তার হয়ে কাজ করে আমেনা-মনসুরের স্ত্রী। সেই সুবাদে একটা টাকাও বাড়ি ভারা লাগে না। অবশ্য এটাকে এখনও বাড়ি বলা চলে না, কনক্রিটের একটা কঙ্কাল বলা চলে। তাই কেয়ারটেক করার কিছু নাই। শুধু দখলদারিত্বের দায়ভার বহন করে চলা। টিন দিয়ে একরকম জোড়া-তালি দেয়া তার একমাত্র ঘরটা। দুই ছেলেকে নিয়ে বেশ ভালোই কেটে যায় তার। মনসুরের কাজের ধরণ খুব সামান্য আবার এক দিক দিয়ে কঠিন। গাড়ীর লোকদের কাছ থেকে ট্রাফিক সার্জনের সরাসরি টাকা নেয়া কষ্ট। তাতে অনেকের নজর পরে আর একবার যদি কোন সাংবাদিকের দৃষ্টি পরে তাহলে অনেক কিছুই হতে পারে। মনসুর গাড়ীর থেকে এই টাকা তোলার কাজটাই করে। প্রতি গাড়ী ২০০ টাকা। এইভাবে আট ঘন্টার ডিউটিতে গড়ে তিন হাজার টাকা রোজগার হয় রোজ। আর দৈনিক ভিত্তিতে আমিনুল তাকে পারিশ্রমিক দেয়। টাকার অংকটা আমিনুলের জন্য সামান্য হলেও তা মনসুরের জন্য খারাপ না।

আজ মনসুরের মন ভালো নেই। সকাল বেলা চিঠি পেয়েছে সে। গ্রাম থেকে আসা সেই চিঠির বিষয়বস্তু ভয়াবহ, মনসুরের বড় ভাই বাসে উঠতে গিয়ে গন্ডগোল বাধায় কন্ট্রাকটরের সাথে আর তা থেকেই হাতাহাতি শুরু হয় আর বাস-স্ট্যাফ তাকে বেদম পিটুনি লাগায়। তার ভাই এখন হাসপাতালে। অবস্থা বেশ খারাপ। কিছু একটা হয়েও যেতে পারে। কিছু একটা হলে অবশ্য এক দিক দিয়ে ভালোই হয়। কোন পিছুটান আর থাকে না। জন্মের শক্ত শিকরটা খুব সহজেই আলগা করে নিতে পারবে সে। হিসেবমতন তাকে আজই যেতে হতে পারে কিন্তু তার যাওয়ার কোন উপায় নাই। অনেক কাজ তার। এইসব কাজ না করলে তাকে একরকম না খেয়েই থাকতে হবে। এই ধরনের কাজ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এই ঈদের সময়ে তার কোনো দরকার নাই হাতে ধরে এই কাজটা হারার।

আজ শফির মনটা খুব উড়ু উড়ু করছে। মেঘমুক্ত আকাশের দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকার ফলে যেরকম ঔদাসিন্য আচ্ছন্ন করে অনেকটা সেরকম উদাস। আজকে কাজে না যেয়ে বরং তার মার্বেল খেলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু বাকী ছেলারা তার এই প্রস্তাবে রাজি হওয়র কথা না। সারাদিনের কাজ এখনও শুরু হয় নাই। ছেলেরা এখনও আসে নাই। সবাই মিলে আজকে কাগজ কুড়াতে যাবে বনানী পার্কে। মজাই হওয়ার কথা। বনানী পার্ক জায়গা হিসেবে ‘ফাছ কেলাস’। পাতা কুড়াতে কুড়াতে গান শোনা যায়। আজিব ব্যপার, মানুষের কাজ কামের যে কি তামাসা! শফি মনে মনে ভাবে। অবশ্য তাকে অনেক কিছুই ভাবতে হয়। এগারো বছরের এই ছোট্ট নির্মম জীবন তাকে অনেক কিছু ভাবতে বাধ্য করেছে। যেমন, যে বার সাদা-গাড়ীটাতে করে ময়না বু’কে কিছু লোক উঠায়ে নিয়া গেল এবং দু’দিন কান্নাকাটির পর সবাই ভুলে গেল সব-শফি খুব ভেবেছে সেই সময়টা। অবশ্য ভাবনার অনেক কারণ। ফুলিও বড় হচ্ছে। আর সাদা গাড়ির সাথে এখন একটা নীল গাড়িও জুটেছে। গাড়িতে-গাড়িতে বন্ধুত্ব খুব তাড়াতাড়ি বেড়ে যায়। ফুলি শফি’র একমাত্র বোন। শফি আর ফুলি থাকে বনানী টেলিফোন অফিসের বস্তিতে এক বৃদ্ধার সাথে। বৃদ্ধার সাথে তাদের কোন পারিবারিক সম্পর্ক নেই কিন্তু আত্মীয়তা আছে। বৃদ্ধা খুব ছোট থেকেই বড় করছে এই দুইজনকে। স্ত্রী জাতির মা-মনটা কখনই বুঝি মরে না।

বিকেল বেলা নিজের কাগজের বোঝাটার দিকে তাকিয়ে বেশ হাসিখুসি হয়ে ওঠে শফির মন। অনেক ভালো ভালো কাগজ আজকে সে পেয়েছে। হেসে খেলেই ১৫ টাকা পাওয়া যাবে। সবাই দলবেধে সর্দারের কাছে যাচ্ছে কাগজ বেঁচতে। শফির খুব ভালো লাগে যখন সর্দার হাতে টাকা তুলে দেয়। টাকা জিনিসটা শফি’র খুব ভালো লাগে। টাকার মূল্যই তার এই ভালো লাগাটার জন্ম দিয়েছে। ইদানিং ঘুমের মধ্যেও সে টাকাকে স্বপ্নে দেখে। আজকে বিশাল লাইন পড়েছে। শফি লাইনের অনেক পিছনে। অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাকে। যদিও অপেক্ষা করতে তার খুব ভালো লাগে না। অপেক্ষা মানেই সময়ের অপচয়। আর শফি’র বৈচিত্রময় জীবন কিছু বুঝুক আর নাই বুঝুক সুর্যের উপস্থিত সময়টাকে খুব গুরুত্বের সাথে দেখে। তাকে দেখতে হয়। অনেক্ষন পর শফি কাগজগুলো দেওয়ার সুযোগ পায়। ‘কীরে শইফ্ফা, তর কাগজ গুলান তো চিল্লিক পারতাছে! কই থাইক্যা আনলি?’ সর্দার বেশ তাচ্ছিল্যের সাথে বলে। ‘পাইছি। তয় কই পাইছি তা কইবার পারুম না। পোলাপান হুনব’ শফির জবাব। ‘ঠিক আছে পুরা ১৭ ট্যাকাই পাবি। কাইল নিয়া যাইস’ সর্দার বলে। শফির চেহারা অন্ধকার হয়ে আসে। কী হবে এখন! আজকের দিনটাতে টাকা অবশ্যই দরকার, বুড়ির আস্তানায় চাউল নাই। চাউল না নিতে পারলে তিন তিনটা মানুষের উপোস যাবে রাতটা। যেদিন টাকা পরের পকেটে থাকে সেদিন ক্ষধাটা খুব বেড়ে যায়। এটিই শফির ভয়। আরো ভয় ফুলিরে নিয়া। ফুলি’র ধারণা শফি তারে খাইতে দিবেই। আরো সমস্যা বুড়ির ঘরেরও চাউল শেষ। বুড়ির ছেলে গত সপ্তাহে আসতে পারে নাই। একেবারে বিপদের উপরে বাঘের বাচ্চা।

আমিনুলের মনে আজ বেশ ফুর্তি। অনেক টাকা আজকে পকেটে এসেছে। চার হাজার সাতশ সত্তুর টাকা। এই আশাতীত অর্থযোগের পরিণামে সে শীষ দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তদেহে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। আমিনুল তবুও চেষ্টা করছে। এই রকম রোজ টাকা আসলে তার একটা স্বপ্ন পূরণ হবে এবার। সে একটা মাইক্রবাস কিনে দিবে বাড়িতে, ভাড়া খাটার জন্য। ভারার টাকায় তার পরিবারে একটা বাড়তি স্বচ্ছলতা আসার কথা। আমিনুল মোটর সাইকেলের গতি অজান্তেই বাড়িয়ে দেয় এবং পরক্ষণেই তা সাভাবিক অবস্থায় ফিরে আনে। আমিনুল খুব সাবধানি হয়ে ওঠে। জীবনের যতগুলোন সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে সবগুলোই হয়েছে তার খুশির কারণে। মহাখালির ফ্লাইওভার সমস্যা এড়াতে সে আজকে তেজগাঁ দিয়ে ঢুকে পড়ল। গুলশান এলাকা ছেড়ে কাকলী দিয়ে বেড় হওয়ার ইচ্ছা তার। পেটের ক্ষিধেও মাথা চাড়া দিয়ে তার প্রয়োজনের কথা স্মরণ করে দিচ্ছে বার বার। বনানী বাজারের কাছে এসে সে একটি রেস্টুরেন্ট খোলা পেল। সস্তার রেস্টুরেন্ট, সামনে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে দাড়িয়ে। মোটর সাইকেল থেকে সে নামতেই দোকানের ছেলেটি বেশ ভীত চোখে এগিয়ে আসে। ট্রাফিক সার্জন এবং পুলিশ ইন্সপেক্টরের মধ্যে কোন পার্থক্য সে করতে পারে না। অবশ্য অস্বাধারণ মানুষরাও এই পার্থক্য সহজে করতে পারবে না। ট্রাফিক সার্জনদের সার্টের ঘারে যে দুইটা লাল দাগ থাকে সেটিই একমাত্র তাদের পরিচয় বহন কারী। এই ক্ষুদ্র পার্থক্য সবাই করতে পারারা কথ না। ‘কী খাইবেন ছার?’ বেশ সংশয়ে দোকানের ছেলেটি জিজ্ঞেস করে। তার ভয় এই পুলিশ আবার টাকা চাইয়া বসে কীনা। আরো ভয় খাওয়া শেষে বিল না দিয়াই চলে যেতে পারে। আমিনুল ভিতরে ঢুকে সবচেয়ে ভালো খাবার গুলোর অর্ডার দিয়ে দেয়। দোকানে দ্বিতীয় কোন খদ্দের নেই। সে খেতে শুরু করে।

বনানী বাজারের এই খাবারের দোকানটায় এর আগেও ফুলি সহ অনেকবার খেয়েছে শফি। সেই সুবাদে দোকানের কর্মচারির সাথে তার সামান্য পরিচয়ও আছে। সেই সামান্য পরিচয়ের ভরসায় আজকে দোকানে এসেছে সে; যদি বাকীতে দোকানের ছেলেটি তারে খাওয়ায়। কিন্তু পুলিশ ছারের খাওয়া নিয়া সে যেমন ব্যস্ত কথাটা তাকে বলাও যাচ্ছে না। অন্যদিন যে সাহসে দোকানে নির্দিধায় প্রবেশ করা ছিল তার স্বাভাবিকতা, আজকে সেই সাহসটি পকেট থেকে হাওয়া। তাই দুই ভাই বোন দাড়িয়ে পুলিশ ছারের খাওয়া দেখছে। এই সময় দোকানের লোকটি তাদের দিকে তাকায়। কর্মচারিটি বেড় হয়ে আসে। ‘কীরে শফি, বাইরে দাড়ায় আছস ক্যান? ভিতরা আয়। খাবি না?’ শফি ভারী অবাক হয়। এই লোক তারে নাম ধইরা ডাকল! তার নাম সে মনে রাখছে! শফি তবুও ভিতরে যায় না। দাড়িয়েই থাকে। আর ফুলি তার হাত ধরে সমানে টানছে ভিতরে যাওয়ার জন্য। টাকা জিনিস টার মাহত্য এখনও তার বুদ্ধির সীমায় আসে নাই। তাই সামনে খাবারের সম্ভার তার ছোট্ট মাথায় রিতিমতন বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে দিল। দোকানের লোকটা তাদের এই পরিস্থিতির কারনটা আঁচ করতে পারে। এমনিতেই আকাশ খারাপ হওয়ার কারণে দোকানে মনে হয় না আজকে আর কোন কাস্টমার আসবে। আর না আসলে অনেক খাবার এমনিতেই তাদের নষ্ঠ হবে আজবে। তাই বলে বসে ‘কীরে ট্যাকা নাই?’ শফি মাথা নাড়িয়ে তার জবাব দেয়। ‘আইচ্ছা যা, আইজ ট্যাকা না দিলেও চলব। পরে আইসা দিয়া যাইস।’ শফির চোখে পানি এসে যায়। এ যেন একুইরিয়াম মাছের নদী আবিস্কার!

শফি’দের কথপোকথন আমিনুলের কানে আসে। তার পাতে তখনো অর্ধেক খাওয়া মুরগীর রান। একপাশে পাংগাস মাছের পেটি। কী মনে করে সে বরে ফেলল ‘বাচ্চা দুইটারে মুরগী আর পাংগাস মাছ দে। ওরা খাউক। আমি দেখি।’ দোকানের লোকটি চাওয়া-চাওয়ি করে। তারপর আমিনুলের অর্ডার দেয়া খাবার গুলো এগিয়ে দেয় শফি’র টেবিলে। একই সঙ্গে মাছ আর মাংস দেখে ফুলি তো চোখ উপরে তুলে আমিনুলকে দেখা শুরু করল। তারপর শুরু করল খাওয়া। বুভুক্ষ মানুষের খাওয়া খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়। খাওয়া শেষে বুড়ির জন্য খাবার প্যাকেট করে নিল তারা। আমিনুলের দিকে মিষ্টি হেসে তারা বিদায় নিল। আকাশের অবস্থা তখন বেশ খারাপ। ‘আজ রাতে ঢাকা শহরের খবর আছে’ আপন মনে বলে আমিনুল। রাতে ভিজতে ভিজতে সে বাসায় পৌছল। তখন রাত ঠিক বারটা। এসময় তার মোবাইল ফোনে অজানা একটা নাম্বার থেকে ফোন এল। আমিনুল ধরতে গ্রাম থেকে ফোন করা ওপাশের চাচা জানাল যে মনসুরের ভাই মারা গেছে। ফোন রেখে দেওয়ার পর সে খালেকের বাসার পাশের ফোনের দোকানের নাম্বারটা বের করে রাখল। সকালে তাকে এই নাম্বারে ফোন দিতে হবে। তার অনেক টাকার দরকার।

সে রাতে প্রবল বর্ষণ হলো। ঢাকা শহরের অনেক রাস্তাঘাট গেল ডুবে। কাগজ কুড়োনিরা যেসব কাগজ পরের দিন কুড়াবে বলে ভেবে রেখেছিল তা গেল ভিজে। কিন্তু তারপর!

তারপর আবারো সকাল হয়। আবারো একটি দিনের জীবন সংগ্রামে নামে প্রতিটি মানুষ তার স্ব-স্ব ক্ষেত্রকে ঘিরে। আর একটি গল্পের জন্ম হয় এই ভাবে।

মিরপুর-ঢাকা

২৫ সেপ্টেম্বর/২০০৪