এই রাতে আমারে রক্ষা করো

আমার কাছের মানুষজন ভালো ভাবেই জানেন বব মার্লের প্রতি আমার ভালোবাসার কথা। খুব ছোট বেলায় কোন কিছু না ভেবে, না জেনেই শুধুমাত্র অদ্ভুত মিউজিকের জন্য ভালোবেসে ফেলেছিলাম অদ্ভুত চুলের ভদ্রলোককে। 
আমার জন্ম ১৯৮০ সালের ২১ শে জুন। সেই বছর একটা গান লেখা হয়েছিল, Redemption Song. আমি ঘরোয়া আড্ডায় সবসময় বলি সেই গানটা আমার জন্ম উপলক্ষে লেখা হয়েছিল। যদিও বিপ্লবী হতে পারি নাই। নিজের সাথে নিজের বিপ্লবটাও প্রায় অসমাপ্ত।
বব মার্লের একটা জনপ্রিয় গান No Woman No Cry. এই গানটার এতোদিন ভুল অর্থ করে এসেছিলাম। কিন্তু গতরাতে বন্ধু Simu Naser এই ভুলটা ভেঙে দিয়েছে। সিমু বলল ক্যারিবিয়ানরা নো শব্দটা আগে ব্যবহার করে। গানটার অর্থ আসলে ‘না, তুমি কেঁদ-না, রমনী।’ 
যাই হোক এখন বসে আছি ইয়েলো ক্যাফেতে। পাশে বিকট শব্দে একজন গায়িকা ‘লাগ যা গালে ফের’ গেয়ে যাচ্ছেন। বাইরে ঝর হচ্ছে। এই ঝরের রাতে, এই বিজাতীয় সঙ্গীত যন্ত্রণা দিচ্ছে। বেক্সিমকো গ্রুপ জোর করে এই সঙ্গীতের প্রতিদিনের আয়োজন করে কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, এটা নিয়ে ভাবছি। 
দিনে দিনে ঢাকা শহরটা একটা অন্তঃসারশূণ্য নগরে পরিণত হচ্ছে। পরিচয়হীন, দয়াহীন এবং আত্মসম্মানহীন একটা সংষ্কৃতিতে বাস করছি।

প্রিয় একটা গান শেয়ার করছি।

নৈতিকতার স্খলন দেখেও –
মানবতার পতন দেখেও-
নির্লজ্জ অলস ভাবে বইছ কেন?
সহস্র বরষার-
উন্মাদনার-
মন্ত্র দিয়ে- লক্ষজনেরে-
সবল সংগ্রামী, আর অগ্রগামী
করে তোলো না কেন?
বিস্তীর্ণ দুপারের, অসংখ্য মানুষের-
হাহাকার শুনেও,
নিঃশব্দে নীরবে- ও গঙ্গা তুমি-
গঙ্গা বইছ কেন?

জ্ঞানবিহীন নিরক্ষরের-
খাদ্যবিহীন নাগরিকের
নেতৃবিহীনতায় মৌন কেন?
সহস্র বরষার-
উন্মাদনার-
মন্ত্র দিয়ে- লক্ষজনেরে-
সবল সংগ্রামী, আর অগ্রগামী
করে তোলো না কেন?
বিস্তীর্ণ দুপারের, অসংখ্য মানুষের-
হাহাকার শুনেও,
নিঃশব্দে নীরবে- ও গঙ্গা তুমি-
গঙ্গা বইছ কেন?

বিস্তীর্ণ দুপারের, অসংখ্য মানুষের-
হাহাকার শুনেও,
নিঃশব্দে নীরবে- ও গঙ্গা তুমি-
গঙ্গা বইছ কেন?

ব্যক্তি যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিক,
সমষ্টি যদি, ব্যক্তিত্বরহিত,
তবে শিথিল সমাজকে ভাঙো না কেন?
সহস্র বরষার-
উন্মাদনার-
মন্ত্র দিয়ে- লক্ষজনেরে-
সবল সংগ্রামী, আর অগ্রগামী
করে তোলো না কেন?

স্রোতস্বিনী কেন নাহি বও?
তুমি নিশ্চয়ই জাহ্নবী নও
তাহলে, প্রেরণা দাও না কেন?
উন্মত্ত ধরার-
কুরুক্ষেত্রের-
শরশয্যাকে আলিঙ্গন করা-
লক্ষকোটি ভারতবাসীকে, জাগালে না কেন?
বিস্তীর্ণ দুপারের, অসংখ্য মানুষের-
হাহাকার শুনেও,
নিঃশব্দে নীরবে- ও গঙ্গা তুমি-
গঙ্গা বইছ কেন?

**//** ইয়েলো ক্যাফে, ধানমন্ডি, ঢাকা।

সম্পর্ক

মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক বিষয়টা বড় জটিল। কোন মানুষকে কারণ ছাড়াই ভালো লাগে আবার কাউকে কোন কারণ ছাড়াই বিরক্ত লাগে। যাদের কারণ ছাড়াই ভালো লাগে তারা যে আবার আমাকে ভালো পাবে, সেটার কোনও গ্যারান্টি নেই। সবশেষে যখন ব্যাটে বলে মিলে যায়, একটা সম্পর্ক হয়। সম্পর্ক হওয়া এবং টিকে থাকার আবার কোন ফরমুলা নেই। অনেকটা একটা সিনেমা হিট হবে নাকি ফ্লপ হবে, তেমন একটা ব্যাপার। তারপরেও আমার কাছে এক একটা সম্পর্ক লটারির মতো। যেটা লেগে যায় কিছুদিন ভালোই থাকে। এরপর আস্তে আস্তে আমি টা বড় হয়। একটা সময় সম্পর্কে আর তুমি থাকে না, সবই আমি তখন ঠিক পাশের তুমি জন ঠিক ভালো পায় না। সম্পর্ক কেমন করে জানি দূরে চলে যায়। 
বিগত বছরগুলোতে অনেক ধরনের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হলাম। আজকে চিন্তা করে দেখলাম ঠিক কারোরি উপর কোন রাগ নেই বা অভিমান নেই। দিন শেষে কিছু ভালো স্মৃতিই ভাণ্ডারে থাকে। প্রতিটা সম্পর্ক আসলে এক একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো। অনেক কিছু শিক্ষা দিয়ে যায়। 
এখন রাত বিরেতে সুপ নুডুলস এর জন্য মায়া হয় আবার শিং মাছ দেখলে মনে পড়ে যে এই মাছ সম্পর্ক ধরে রাখার মতো। মাঝে মাছে এই জিয়ল মাছে খাবার দিতে হয়। নইলে মরে যায়। সম্পর্কের মানুষগুলো একে একে হয়তো আলোকবর্ষ দূরে চলে যাবে কিন্তু ছায়ার মতো কিছু অভ্যাস কষ্ট দিতে থাকবে। একেই হয়তো সত্যিকার অর্থে মিস করা বলে। সমস্যা হলো এই সভ্য সমাজে কাউকে প্রকাশ্যে মিস করাও যায় না। আহারে!

**//** ধানমন্ডি, ঢাকা।

মেটাসটেসিস কার্সিনোমা | Metastasis Carcinoma

Nazrul Islam | Photograph by Carlos Cazalis. Chairman Bari, Kurigram.
বড় অদ্ভুত টাইটেল। এই শব্দ দুটির সাথে খুব কম মানু্ষের পরিচয়। শব্দ দুটির সাথে কারো পরিচয় হওয়াটাও সুখকর নয়। তার পরেও কিছু মানুষের জীবনে শব্দ দুটি অনেক ভয়ঙ্কর ভাবে আসে। চরম বাস্তবতায়। এই শব্দ দুটির সাথে ক্যানসারের ডাক্তাররা ভালো পরিচিত। এবং এই ক্যানসার যেসব পরিবারে হয় তারা পরিচিত (ফার্স্ট হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স হিসেবে)। দুঃখজনক ভাবে আমি পরের দলে। আমার পরিবারে এই অসুখ হয়েছিল। অতীত কালে লিখতে হলো। যার হয়েছিল তিনি আমার বাবা। নজরুল ইসলাম (চেয়ারম্যান)।
প্রথম দিকে আমার ধারনা ছিল যে ক্যানসার বড় অসুখ নয়। কেমো থেরাপি, রেডিও থেরাপি দিয়ে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। খুবই সরল একটা ধারণা। বাবার যখন ক্যানসার ধরা পরল সেদিনটার কথা আমার মনে আছে। বড় ভয়ঙ্কর অনুভূতি।
ভারত এবং নেপালের মাঝে বেড়াতে গেছি। জায়গাটার নাম সান্দাকফু। ইনাম, জুই, ইনাম কন্যা, মনোয়ার ভাই এবং আমি। আমরা একটু বেশী এডভেঞ্চার করতে গিয়ে লালমনির হাট দিয়ে রওনা হই। তাই ফেরার সময় একই ইমিগ্রেশন। কুড়িগ্রামের কাছে তাই সুযোগটা হাতছাড়া করি নি। সবাই সহ বাড়িতে চলে যাই।
বাড়িতে গিয়ে দেখি আমার বাবা পিঠের ব্যাথায় ছটফট করছেন। তাই ঢাকা ফেরার সময় এক রকম জোড় করে তাকে নিয়ে আসি। আসতে চাচ্ছিলেন না। অনেক কাজ। চির জীবন কাজ করেই গেলেন। ঢাকায় এসে হাড়ের ডাক্তার দেখালাম। ওনার যাবতীয় এক্সরে এবং সিটি স্ক্যান শেষে বললেন বায়োপসি করাতে হবে। করানো হলো। সেই স্যাম্পল দুই জায়গায় দেয়া হলো। এক জায়গায় আসল ব্লাড ক্যান্সার এবং অন্য জায়গায় মেটাসটেসিস কার্সিনোমা।
My Father in front of his house with my sister Ruksi. Photograph taken by me.
ব্লাড ক্যান্সার দেখেই মাথা খারাপের মতো অবস্থা। মরা কান্না সবার। আবার বাবার সামনে সবাই হাসিমুখ। যেন কিছুই হয় নাই। সব ঠিকঠাক। আর আমাদের বালিশগুলো প্রত্যেক রাতে ভিজে। দিনের বেলা শুকায়। আমরা ব্লাড ক্যান্সারকে মেনে নিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলা শুরু করলাম। ডাক্তার জানালেন ব্লাড ক্যান্সারের ভালো চিকিৎসা আছে। ভয়ে মরে যাওয়ার কিছু নেই। আমার বাসায় হুট করে শান্তি। অনেক দিন পর ফিরে এসে ভাত খেলাম। তারপর ঘুম। অনেক দিনের ঘুম। আরামের ঘুম। বাসায় মোটামুটি আনন্দ ঘন পরিবেশ। নিশ্চিত মৃত্যু থেকে রেহাই।
যেহেতু দুই জায়গায় দুই রিপোর্ট তাই নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরো অনেকগুলো পরীক্ষা করা হলো। এবং অবশেষে জানা গেল যে তার ব্লাড ক্যান্সার নেই। তবে পরের টা নিশ্চিত। তখন আবার নতুন করে পরীক্ষা যে ক্যান্সারটির উৎপত্তি কোথায়। পরে জানা গেল ফুসফুসে। আমাদের আবার কান্নার রোল। জোয়ার ভাটার মতো অবস্থা।
আমি এবং মা গেছি রিপোর্ট আনতে মেডিনোভায়। পেট সিটি স্ক্যানের (PET CT Scan)রিপোর্ট হাতে নিয়ে দেখি প্রাইমারি টিউমার ফুসফুসে। কাক তালিও ভাবে বাবা সেই সময়েই ফোন করলেন। এবং আমার মাকে তার জন্য সিগারেট আনতে বললেন। আমার মা রেগে আগুন। ফুসফুসে ক্যান্সার জেনেছেন মাত্র কয়েক মিনিট আগে। তার উপরে সিগারেটের আবদার।
বাসার এসেই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ। শুরু হলো কেমো এবং রেডিও থেরাপি। তারপরও মনে আশা। অনেক বেঁচে থাকবেন বাবা। এর পিছনে বড় শক্ত একটা যুক্তি ছিল। আমার নানী দীর্ঘকাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে ছিলেন। সেই ভরসায় আমাদের নতুন চিন্তা শুরু হলো।
দিনে দিনে বাবার শরীর খারাপ হওয়া শুরু করল। মাথার চুল হাওয়া। মুখে কালি। বড় কষ্টের সেসব দিন। এর মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ মারা গেলেন। আমার স্মার্ট বাবা খুবই আপ সেট হয়ে গেলেন। তার যুক্তি “এত বড় মানুষ। এত ভালো জায়গায় চিকিৎসা করেও বাঁচালেন না। আমি কোথাকার কে?”।
আমি এবং মা আবার ঘটা করে ডাক্তারের কাছে গেলাম। আমার সকল আশাকে গুড়িয়ে দিয়ে ডাক্তার একটা বাজে কথা শোনালেন। এই ক্যান্সার মেটাসটেসিস। এটা হলে গড়ে ১ থেকে দেড় বছর মানুষ বাঁচে। আমি অনেক কষ্টে নিজেকে অজ্ঞান হওয়া ঠেকালাম সেদিন। বাসায় এসে পুরো ভেঙে পরা একজন মানুষ। মাথার উপরের শক্ত ছাঁদ ভেঙে যাবে? আবার আমাকে শক্তও হতে হবে। নজরুল চেয়ারম্যানের একমাত্র পুত্র আমি। অনেক দায়িত্ব। অনেক কঠিন দায়িত্ব।
দেশের ডাক্তারদের কথায় আর ভরসা না পেয়ে একরকম রাতারাতি বাবাকে নিয়ে চলে গেলাম কলকাতা। টাটা মেডিকেল সেন্টারে। আবার একই চিকিৎসা। তারপর একদিন তিনি বৃদ্ধ হলেন, বনস্পতির ছায়া দিলেন সারা জীবন।
এই লেখা লিখতে পারছিলাম না। গত ২০ দিন থেকে চেষ্টা করেও শেষ হয় না। একটা লাইন লিখি। মনিটর দেখি না। ঝাপসা হয়ে যায়। লেখা শেষ হয় না। বড় কষ্ট। প্রতিটা দিনের কথা মনে পড়ে। বাবার মুখটা মনে পড়ে। আমার সবচেয়ে বড় সাপোর্টার ছিলেন। আমার মুগ্ধ ভক্ত। আমার সব কিছুতেই যার অনেক গর্ব ছিল। সেই বাবাকে নিয়ে আমার লেখা থমকে থাকে। তারপরও লিখলাম। আবার লিখব।
আমি লিখব আমার রাত জেগে থেকে বাইরের সব বড় বড় মেডিকেল রিসার্স সেন্টারের সাথে যোগাযোগ করা। টেস্ট মেডিসিনের চেষ্টা করা। এবং ঘন্টার পর ঘন্টা ক্যান্সার নিয়ে পড়াশুনা করার কথা।
Humayun Ahmed | Photograph by Shakoor Majid.
লিখলাম কারণ কিছুদিন থেকে দেখছি হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে আবারো উত্তেজিত ফেসবুক। ওনাকে নাকি মদ খাইয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। হায়রে! গাধার দল। হুমায়ূন আহমেদ এবং আমার বাবা একই রোগে মারা যান। যার আয়ুষ্কাল গড়ে ১ থেকে দেড় বছর। অসুখটার নাম মেটাসটেসিস কার্সিনোমা। সবচেয়ে বাজে ধরনের ক্যানসারের একটি। কারো আগ্রহ থাকলে গুগুল করে দেখেন।

প্রিয় রূপকথা

রূপকথা আমার মেয়ের নাম। ওর এখনো জন্ম হয়নি। তবে হবে কোন একদিন। মেয়ের জন্য এই নামটি রেখেছিল আমার ছোট বোন রুকসি; অনেক আগে… প্রায় ৫বছর হবে। তখন রূপকথা অধ্যায় বা আমার সন্তান বিষয়ক কোন আগ্রহ ছিল না। কিন্তু এখন আমি অনুভব করি আমার মেয়েকে।

যখন আমি অনেক আনন্দ বা বেদনার সাথে থাকি আমার মেয়েকে অনুভব করি। তখন শুধূ মনে হয় মন খারাপ করার মতোন কিছু ঘটেনি। আমার মেয়ে আমার সাথে আছে। আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী।

এইযে এখন গভীর রাতে বসে বসে গান শুনছি আর মেয়েকে চিঠি লিখছি: এটা এক ধরনের আশ্রয়। আশ্রয়হীন মানুষ মাত্রই আঁকড়ে ধরে বাঁচি। আমার সন্তান: তোমার জন্য রেখে যাওয়া পৃথিবীটা হয়তো অনেক শীতল হবে! হয়তো বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য তুমি কষ্ট পাবে। আমাকে ক্ষমা করে দিও। একজন দুর্বল বাবা: তোমার জন্য ভালো একটা পৃথিবী বানাতে পারেনি!

আমি মালদ্বীপের মানুষদের হাহাকার শুনতে পাই, শুনতে পাই নিজের দেশের আর্তনাদ। কিছুই করতে পারছি না। একটা বড় দেহে পঁচন ধরেছে: থামাবার কোন উপায় নেই। বসে বসে একটা সুন্দর অনাগত স্বপ্নের মৃত্যুদৃশ্য দেখা!