সবচেয়ে প্রিয় শিল্পী, প্রিয় গান এবং প্রিয় গীতিকার

আমার তিন প্রিয় বিষয় এক সাথে এই গানে। শচীন কর্তা’র গান। গীতিকার মীরা দেব বর্মন। কতবার গানটা শুনেছি সেই হিসেব অনেক পড়ে বরং বলা উচিত দিনে কতবার শুনি! অনেক গান আছে যেগুলো কিছুদিন পড়ে আর ভালো লাগে না বা হঠাত হঠাত ভালো লাগে। এই গানটা অনেক ব্যতিক্রম। যতদিন যাচ্ছে নতুন নতুন ভাবে এই গানটার প্রতি ভালোবাসা তৈরী হচ্ছে। এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রেমের গান এটি। গানকে ভালোবেসে ঘর বাঁধলে এটি সম্ভব।

১৯৩২ সালের দিকে কর্তার গানের গুরু ছিলেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়। গুরুর থেকে বয়সে ২-৩ বছরের ছোটো ছিলেন তিনি। সেখানেই পরিচয় ভীষ্মদেবের আর এক কৃতী ছাত্রী মীরা দাশগুপ্তর সঙ্গে। ১৯৩৮ সালে বিয়ে করেন এই গুনী দম্পত্তি।

0_marriage

২৭ জুন ১৯৩৯ এ জন্ম হয় রাহুল দেব বর্মন এর। পরবর্তিতে স্বামী এবং ছেলের নেপথ্যে থেকে কখনো সামনে আসেন নি মীরা দেবী। অন্তরালেই থেকেছেন সব সময়। লিখে গেছেন কিছু বিখ্যাত গান। যে গানগুলন সবাই শুনেছেন। কিন্তু কখনো জানতে পারেন নি গীতিকার কে। মীরা দেবী’র বিখ্যাত কিছু গান হলো:

  • ঘাটে লাগাইয়া ডিঙ্গা পান খাইয়া যাও বাঁশী
  • তাকডুম তাকডুম বাজাই
  • নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক
  • বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে
  • রঙিলা রঙিলা রঙিলা রে রঙিলা
  • কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া

এখন মনে হয় অনেকেই চোখ কপালে তুলে বলছেন “আরে এই গান গুলন এনার লেখা?”। প্রথমবার আমার এমনই মনে হয়েছিল। অবস্য গানগুলোর যে অদ্ভুত দোলা তার জন্য শচীন কর্তা অনেক বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে। সব গুলো গানের সুরকার তিনি।

গানের সংসার। সত্যিকারের গানের বসবাস। যতবার বর্ণে গন্ধে শুনি ততবার চোখ ভিজে যায়। এত সুন্দর প্রেমের গান আর পৃথিবীতে তৈরী হবে না। হওয়ার উপায় নাই। যতবার এই গান শুনি ততবারই মনে হয় আমি প্রচন্ড ভাবে প্রেমে পড়ে আছি। কিন্তু কার প্রেমে পড়েছি বা পড়ে আছি এটা কখনো মাথায় আসে না। কিন্তু এই যে প্রেম প্রেম নেশা, এই যে আকুলতা বা এই যে উথাল পাথাল ভাবনা, এটা অনেক পবিত্র। এই পবিত্রতা নিয়ে থাকতে আমার ভালো লাগে। ইট কাঠের এই শহরে প্রত্যেকদিন প্রেমে পরছি এই গানটার জন্য। আহা! কি সৌভাগ্য আমার।

২০০৬ সালে একবার আমার মাথা খারাপ হয়ে গেলো। আগস্ট মাসে। এই গানটা মাথার মধ্যে ঢুকে গেলো। বের হয় না। অফিস এ, বাসায়, রাস্তায় এবং ঘুমের মধ্যেও এই গানটা শুনেছিলাম। মাথা খারাপের দশা ছিলো ৯ দিন। তারপরে অনেক কড়া ঘুমের অষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম পুরো একদিন। তবেই রক্ষা। সেই ঘটনার পড়ে কিছুদিন গানটা শুনতে ভয় পেয়েছিলাম। পাছে আবারও আটকা পড়ে যাই!

একটা গান কত সহজে আমাকে রোমান্টিক করে দিতে পারে। একটা গান কত সহজে মনে করে দিতে পারে যে আমি প্রেমের মধ্যেই থাকি। একটা গান কতটা সহজে প্রমান করে দেয় যে আমার এখনো মৃত্যু হয় নাই। একটা গানের এত বড় শক্তি? একটা গান এত বড় স্বপ্ন দেখাতে পারে! প্রত্যেকদিন মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীটা অনেক রোমান্টিক, পৃথিবীটা অনেক সুন্দর!

একজন মানুষ কতটুকু রোমান্টিক হলে এমন করে ভাবতে পারেন? লিখতে পারেন? কি সুন্দর ভালোবাসার উপস্থাপন! কি সুন্দর কথামালা! চোখে জল কি আর এমনি আসে?

আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি গান হচ্ছে মানুষের সৃষ্ট সবচেয়ে বড় শিল্পকর্ম। আর এই গানটি পৃথিবীর সেরা সৃষ্টি। আমি অনেক ভাগ্যবান যে এই সেরা কাজটি আমার ফোনে এ, কম্পিউটার এ, আইপড এ এবং আমার মিউজিক সিস্টেম এ। ধন্যবাদ টেকনোলজি।

বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে
হৃদয়ে দিয়েছ দোলা
রঙেতে রাঙিয়া রাঙাইলে মোরে
একি তব হরি খেলা
তুমি যে ফাগুন রঙেরও আগুন
তুমি যে রসেরও ধারা
তোমার মাধুরী তোমার মদিরা
করে মোরে দিশাহারা

মুক্তা যেমন শুক্তিরও বুকে
তেমনি আমাতে তুমি
আমার পরানে প্রেমের বিন্দু
তুমিই শুধু তুমি

প্রেমের অনলে জ্বালি যে প্রদীপ
সে দীপেরও শিখা তুমি
জোনাকি পাখায় ঝিকিমিকি নেচে
এ হৃদি নাচালে তুমি
আপনও হারায়ে উদাসি প্রানের
লহ গো প্রেমাঞ্জলি
তোমারে রচিয়া ভরেছি আমার
বাউল গানের ঝুলি

চমকি দেখিনু আমার প্রেমের
জোয়ারও তোমারই মাঝে
হৃদয় দোলায় দোলাও আমারে
তোমারো হিয়ারই মাঝে
তোমারও প্রানের পুলক প্রবাহ
নিশীতে চাহে আমাতে
জপ মোর নাম গাহ মোর গান
আমারি একতারাতে

নি-ছক

একুশটা বছর! কেমন করে যে চলে গেলো বুঝতে পারলাম না. সময় চলে যায়; গভীর রেখাগুলন থেকে যায়। তবুও একুশটা বছর! একুশ বছর পরে মেয়ের সাথে আমার দেখা হবে! কত বড় হয়েছে সে? দেখতে কেমন হয়েছে? কেমন করে সে হাসে? কার মতন দেখতে হয়েছে? চুলের রং কি? এ ধরনের অনেক প্রশ্ন মনে আসছে। অপেক্ষা করছি। অপেক্ষা! অপেক্ষার উত্তেজনা।

আমার মেয়ে কি দরজার ওপাশে আমার জন্য অপেক্ষা করছে? ওর মা কি আমাকে দেখেতে এসেছে? আর কে কে এসেছে?

আমি শুয়ে আছি বা ঘুমিয়ে আছি একটা হাসপাতালে। আসলে মেয়ের জন্য অপেক্ষা করছি। মেয়ের সাথে দেখা করবো বলেই ঢাকা থেকে ছুটে আসা। এসেই এই বাজে এক্সিডেন্ট। খুব ভালো লাগছে না। মাঝে মাঝে মনে হয় ঘুমিয়ে যাই আবার মাঝা মাঝে জাগি। অন্ধকার সব। কিছুই দেখি না। শরীরটাও অনুভব করতে পারি না।

একুশ বছর আগে ছোট্ট এত্তটুকু ছিলো সে। মাত্র ৭মাস। এরপরে আর দেখা হয় নাই। যে নিখুত সুরে জীবনটা বাঁধা ছিলো; সুরটা হুট করে কেটে গেছে। আর কখনই তাল ফিরে আসেনি। মাঝখানে ২১টা বছর কেটে গেলো।

এই ২১বছরের প্রত্যেকটা দিন মেয়ের কাছে চিঠি লিখেছি। পোস্ট করা হয় নাই। কত রাতের পর রাত পুরনো চিঠিগুলন পড়েছি আর কেদেছি। আহারে! নিজের উপর নিজেরই যত মায়া! আমার মেয়ের হাতে সব চিঠিগুলন তুলে দিবো। আমার মেয়ে কি বাংলা পড়তে পারে?

কাজের জন্য পুরো পৃথিবী ঘুরে বেরিয়েছি। যত সব ভালো ভালো স্থানে পলক ফেলেছি, মেয়েকে মিস করেছি। আসলে অবাস্তবের পাওয়া বাস্তবের থেকেও স্পষ্ট যদি ভালোবাসা থাকে!

চিন্তা গুলন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে! আবার মনে হয় ঘুমিয়ে যাবো। মেয়েটার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।

যখন আমি এইসব চিন্তা করছি তখন আমি সিসিউতে। বাইরে আমার বন, বনের স্বামী ইবন তাদের ছেলে। ডাক্তার এসে জানালো এখন লাইফ সাপোর্ট খুলে দিবে কিনা! অনেক কান্নার আওয়াজ। আমার বন সাইন করে দিলো।

একটি দিনের ক্যানভাস

(প্রিয় পাঠক, এই গল্পটি আগের লেখা। খুঁজে পেলাম কম্পিউটারে। গল্পটি খুব ভালো নয়। কিন্তু আমার ব্লগে আমি লিখলাম। কোন প্রুফরিডিং বা সম্পাদনা ছাড়া। কোন যায় আসে না।)

একশ পচাত্তর টাকা গাড়ীর ব্লুবুকের ভিতর থেকে বের করল আমিনুল। আমিনুল একজন ট্রাফিক সার্জন। সে দাড়িয়ে আছে ফার্মগেইট পুলিশ বক্সের সামনে। তার হাতের ওয়ারলেস থেকে পি পি আওয়াজ বের হচ্ছে, কিছু একটা গোলযোগ ধরেছে তাতে। খুব নির্বিকার ভাবে জিজ্ঞেস করল

-বাকী পচিশ টাকা কই?

সামনে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটি মিইয়ে যায়। তার চোখ জীবন্ত হয়ে ওঠে তাতে প্রকাশ পায় রাজ্যের কাকুতি মিনতি।

-স্যার আজকে আরো এক জায়গায় ধরা খাইছি। আর টাকা নাই (ছেলেটির চোখ ছল ছল করে ওঠে)।

আমিনুল চেহারায় রাগী রাগী একটা ভাব নিয়ে আসে।

-তোদের তো নতুন এই গান, ধরলেই হয় টাকা কম নয়তো আর একজায়গায় ধরা খাইছি। সমস্যা কি?আমিনুল বলে।

-স্যার যা আছে রাইখ্যা দেন, আর একদিন হইব’ ছেলেটি উত্তর দেয়।

আমিনুল ছেলেটির গালে সজোড়ে একটা চর মারে এবং সেই সাথে টাকাটাও পকেটে ভরে ফেলে। তার মেজাজ আস্তে আস্তে বিগড়ে যাচ্চে। এখনও লাইনের মনসুর মিয়া আসে নাই। মনসুর না আসলে তো তার অনেক সমস্যা হবে। নিজে গিয়ে গাড়ী থামিয়ে টাকা নেয় খুব খারাপ দেখাচ্ছে। সামনে ঈদ। অনেক খরচার ব্যাপার। এখন যদি মনসুর এমন করে তাহলে তো মাঠে মারা। নিজের মোটর সাইকেলের উপর বসে আপন মনে সিগারেট টানতে থাকে আমিনুল। বেলা গড়াতে থাকে। এদিকে আকাশের অবস্থাও খুব সুবিধার না। রাত্রে মনে হয় ভালো বৃষ্টি নামবে।

ঢাকা শহরের ট্রাফিক সার্জনদের উপরি টাকা নেয়ার ঘটনা সবার জানা। যেসব গাড়ী রাস্তায় চলে তার অধিকাংশের কাগজপত্র থাকে গোলমালের। সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে পকেট ভর্তি হয় সার্জনের। আর গাড়ি কর্তৃপক্ষ মামলার হাত থেকে বাঁচার জন্য দুইশ টাকা দিতে কার্পণ্য করে না।

গলায় কড়া লাল রঙের একটা মাফলার জড়ায়ে মনসুর রাস্তা পার হচ্ছে। চোখে তার একটা রঙিন রোদ চশমাও দেখা যাচ্ছে। আমিনুল তার সমস্ত গতিবিধি লক্ষ্য করছে। যেমন তার বা পায়ের স্যান্ডেলের একটা ফিতা নাই। তাই খুব কায়দা করে তাকে হাটতে হচ্ছে। আমিনুল এসব খুটিয়ে লক্ষ্য করতে গিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল ভঙ্গ করা একটা রাইডার্সকে সে ধরতে পারল না। এমনিতেই তার মেজাজ খারাপ এবং এবার তাতে বাড়তি যোগ হলো এই ফসকে যাওয়া গাড়ি। মনসুর পাশে এসে দাড়াল। তার মুখ থেকে জর্দার গন্ধ আসছে। আমিনুল এই জর্দার নামও জানে। হাকিমপুরি। লালটি দাঁত নিয়ে মনসুর সামনে দাড়ায়।

-ছালাম ছার। ছারের শইলডা কি ভালা?

মনসুর মিয়ার মুখের বিস্তৃতি হয় অনেক অংশে।

-তোমারে আমি ২৩০ টাকা দিয়া যে ঘড়িটা কিনা দিছিলাম সেই ঘড়িটা কই? আমিনুল বাঁকাভাবে জবাব দেয়।

-আমার ছোড পোলায় ওইডা নিছে, তাই আমার হাতে নাই।’ মনসুরের সহজ স্বীকারোক্তি। -তোমার এইটা কি আসার সময় হলো? আমি তোমারে নিয়া আর পারতেছি না। নাকি আমি খালেকরে কাম দিয়া দিব? খালেক তো এমন করত না। সে আমারটা খুব ভালোই দেখত।’ আমিনুল খিস্তে উঠে।

মনসুর চেহারায় কমনীয়তার উপস্থিতি নিয়ে আসে।

-খালেকরে কাম দিয়া দিলে তো আর আমি কিছু কইতে পারুম না তয় কিনা আপনেরো একটু বিবেচনা করতে হবে। আমারো তো জীবন আছে!’ মনসুর বলে।

-তোমারও জীবন আছে আমারও জীবন আছে। সামনে ঈদ ওই চিন্তাটা কি তোমার মাথায় আছে। অনেক টাকার দরকার এখন আর তুমি কিনা আসো দেরি করে।’ আমিনুল বলে।

-ঠিক আছে ছার, আর দেরি হইব না। ওই যে বাসডা খারাইছে, ওইটারে আগে ধরেন’ মনসুর কথাটা উচ্চারন করেই রাস্তার পাশে দাড়ানো পানের দোকানের কাছে দাড়ায়। আমিনুল বাসটির দিকে এগিয়ে যায়। এবং গাড়ীর ব্লুবুক বের করে আনে।

মনসুর থাকে মিরপুরে। একটা নির্মানাধীন বাড়ির নীচ তলায়। বাড়িটা তার দূর সম্পর্কের মামার। মামা পুরা পরিবার নিয়ে থাকেন জার্মানিতে। মনসুর একাধারে বাড়ির কেয়ারটেকার এবং দারোয়ান। আর যে সময়টা তার বাইরে কাটে সেই সময়ে তার হয়ে কাজ করে আমেনা-মনসুরের স্ত্রী। সেই সুবাদে একটা টাকাও বাড়ি ভারা লাগে না। অবশ্য এটাকে এখনও বাড়ি বলা চলে না, কনক্রিটের একটা কঙ্কাল বলা চলে। তাই কেয়ারটেক করার কিছু নাই। শুধু দখলদারিত্বের দায়ভার বহন করে চলা। টিন দিয়ে একরকম জোড়া-তালি দেয়া তার একমাত্র ঘরটা। দুই ছেলেকে নিয়ে বেশ ভালোই কেটে যায় তার। মনসুরের কাজের ধরণ খুব সামান্য আবার এক দিক দিয়ে কঠিন। গাড়ীর লোকদের কাছ থেকে ট্রাফিক সার্জনের সরাসরি টাকা নেয়া কষ্ট। তাতে অনেকের নজর পরে আর একবার যদি কোন সাংবাদিকের দৃষ্টি পরে তাহলে অনেক কিছুই হতে পারে। মনসুর গাড়ীর থেকে এই টাকা তোলার কাজটাই করে। প্রতি গাড়ী ২০০ টাকা। এইভাবে আট ঘন্টার ডিউটিতে গড়ে তিন হাজার টাকা রোজগার হয় রোজ। আর দৈনিক ভিত্তিতে আমিনুল তাকে পারিশ্রমিক দেয়। টাকার অংকটা আমিনুলের জন্য সামান্য হলেও তা মনসুরের জন্য খারাপ না।

আজ মনসুরের মন ভালো নেই। সকাল বেলা চিঠি পেয়েছে সে। গ্রাম থেকে আসা সেই চিঠির বিষয়বস্তু ভয়াবহ, মনসুরের বড় ভাই বাসে উঠতে গিয়ে গন্ডগোল বাধায় কন্ট্রাকটরের সাথে আর তা থেকেই হাতাহাতি শুরু হয় আর বাস-স্ট্যাফ তাকে বেদম পিটুনি লাগায়। তার ভাই এখন হাসপাতালে। অবস্থা বেশ খারাপ। কিছু একটা হয়েও যেতে পারে। কিছু একটা হলে অবশ্য এক দিক দিয়ে ভালোই হয়। কোন পিছুটান আর থাকে না। জন্মের শক্ত শিকরটা খুব সহজেই আলগা করে নিতে পারবে সে। হিসেবমতন তাকে আজই যেতে হতে পারে কিন্তু তার যাওয়ার কোন উপায় নাই। অনেক কাজ তার। এইসব কাজ না করলে তাকে একরকম না খেয়েই থাকতে হবে। এই ধরনের কাজ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এই ঈদের সময়ে তার কোনো দরকার নাই হাতে ধরে এই কাজটা হারার।

আজ শফির মনটা খুব উড়ু উড়ু করছে। মেঘমুক্ত আকাশের দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকার ফলে যেরকম ঔদাসিন্য আচ্ছন্ন করে অনেকটা সেরকম উদাস। আজকে কাজে না যেয়ে বরং তার মার্বেল খেলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু বাকী ছেলারা তার এই প্রস্তাবে রাজি হওয়র কথা না। সারাদিনের কাজ এখনও শুরু হয় নাই। ছেলেরা এখনও আসে নাই। সবাই মিলে আজকে কাগজ কুড়াতে যাবে বনানী পার্কে। মজাই হওয়ার কথা। বনানী পার্ক জায়গা হিসেবে ‘ফাছ কেলাস’। পাতা কুড়াতে কুড়াতে গান শোনা যায়। আজিব ব্যপার, মানুষের কাজ কামের যে কি তামাসা! শফি মনে মনে ভাবে। অবশ্য তাকে অনেক কিছুই ভাবতে হয়। এগারো বছরের এই ছোট্ট নির্মম জীবন তাকে অনেক কিছু ভাবতে বাধ্য করেছে। যেমন, যে বার সাদা-গাড়ীটাতে করে ময়না বু’কে কিছু লোক উঠায়ে নিয়া গেল এবং দু’দিন কান্নাকাটির পর সবাই ভুলে গেল সব-শফি খুব ভেবেছে সেই সময়টা। অবশ্য ভাবনার অনেক কারণ। ফুলিও বড় হচ্ছে। আর সাদা গাড়ির সাথে এখন একটা নীল গাড়িও জুটেছে। গাড়িতে-গাড়িতে বন্ধুত্ব খুব তাড়াতাড়ি বেড়ে যায়। ফুলি শফি’র একমাত্র বোন। শফি আর ফুলি থাকে বনানী টেলিফোন অফিসের বস্তিতে এক বৃদ্ধার সাথে। বৃদ্ধার সাথে তাদের কোন পারিবারিক সম্পর্ক নেই কিন্তু আত্মীয়তা আছে। বৃদ্ধা খুব ছোট থেকেই বড় করছে এই দুইজনকে। স্ত্রী জাতির মা-মনটা কখনই বুঝি মরে না।

বিকেল বেলা নিজের কাগজের বোঝাটার দিকে তাকিয়ে বেশ হাসিখুসি হয়ে ওঠে শফির মন। অনেক ভালো ভালো কাগজ আজকে সে পেয়েছে। হেসে খেলেই ১৫ টাকা পাওয়া যাবে। সবাই দলবেধে সর্দারের কাছে যাচ্ছে কাগজ বেঁচতে। শফির খুব ভালো লাগে যখন সর্দার হাতে টাকা তুলে দেয়। টাকা জিনিসটা শফি’র খুব ভালো লাগে। টাকার মূল্যই তার এই ভালো লাগাটার জন্ম দিয়েছে। ইদানিং ঘুমের মধ্যেও সে টাকাকে স্বপ্নে দেখে। আজকে বিশাল লাইন পড়েছে। শফি লাইনের অনেক পিছনে। অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাকে। যদিও অপেক্ষা করতে তার খুব ভালো লাগে না। অপেক্ষা মানেই সময়ের অপচয়। আর শফি’র বৈচিত্রময় জীবন কিছু বুঝুক আর নাই বুঝুক সুর্যের উপস্থিত সময়টাকে খুব গুরুত্বের সাথে দেখে। তাকে দেখতে হয়। অনেক্ষন পর শফি কাগজগুলো দেওয়ার সুযোগ পায়। ‘কীরে শইফ্ফা, তর কাগজ গুলান তো চিল্লিক পারতাছে! কই থাইক্যা আনলি?’ সর্দার বেশ তাচ্ছিল্যের সাথে বলে। ‘পাইছি। তয় কই পাইছি তা কইবার পারুম না। পোলাপান হুনব’ শফির জবাব। ‘ঠিক আছে পুরা ১৭ ট্যাকাই পাবি। কাইল নিয়া যাইস’ সর্দার বলে। শফির চেহারা অন্ধকার হয়ে আসে। কী হবে এখন! আজকের দিনটাতে টাকা অবশ্যই দরকার, বুড়ির আস্তানায় চাউল নাই। চাউল না নিতে পারলে তিন তিনটা মানুষের উপোস যাবে রাতটা। যেদিন টাকা পরের পকেটে থাকে সেদিন ক্ষধাটা খুব বেড়ে যায়। এটিই শফির ভয়। আরো ভয় ফুলিরে নিয়া। ফুলি’র ধারণা শফি তারে খাইতে দিবেই। আরো সমস্যা বুড়ির ঘরেরও চাউল শেষ। বুড়ির ছেলে গত সপ্তাহে আসতে পারে নাই। একেবারে বিপদের উপরে বাঘের বাচ্চা।

আমিনুলের মনে আজ বেশ ফুর্তি। অনেক টাকা আজকে পকেটে এসেছে। চার হাজার সাতশ সত্তুর টাকা। এই আশাতীত অর্থযোগের পরিণামে সে শীষ দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তদেহে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। আমিনুল তবুও চেষ্টা করছে। এই রকম রোজ টাকা আসলে তার একটা স্বপ্ন পূরণ হবে এবার। সে একটা মাইক্রবাস কিনে দিবে বাড়িতে, ভাড়া খাটার জন্য। ভারার টাকায় তার পরিবারে একটা বাড়তি স্বচ্ছলতা আসার কথা। আমিনুল মোটর সাইকেলের গতি অজান্তেই বাড়িয়ে দেয় এবং পরক্ষণেই তা সাভাবিক অবস্থায় ফিরে আনে। আমিনুল খুব সাবধানি হয়ে ওঠে। জীবনের যতগুলোন সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে সবগুলোই হয়েছে তার খুশির কারণে। মহাখালির ফ্লাইওভার সমস্যা এড়াতে সে আজকে তেজগাঁ দিয়ে ঢুকে পড়ল। গুলশান এলাকা ছেড়ে কাকলী দিয়ে বেড় হওয়ার ইচ্ছা তার। পেটের ক্ষিধেও মাথা চাড়া দিয়ে তার প্রয়োজনের কথা স্মরণ করে দিচ্ছে বার বার। বনানী বাজারের কাছে এসে সে একটি রেস্টুরেন্ট খোলা পেল। সস্তার রেস্টুরেন্ট, সামনে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে দাড়িয়ে। মোটর সাইকেল থেকে সে নামতেই দোকানের ছেলেটি বেশ ভীত চোখে এগিয়ে আসে। ট্রাফিক সার্জন এবং পুলিশ ইন্সপেক্টরের মধ্যে কোন পার্থক্য সে করতে পারে না। অবশ্য অস্বাধারণ মানুষরাও এই পার্থক্য সহজে করতে পারবে না। ট্রাফিক সার্জনদের সার্টের ঘারে যে দুইটা লাল দাগ থাকে সেটিই একমাত্র তাদের পরিচয় বহন কারী। এই ক্ষুদ্র পার্থক্য সবাই করতে পারারা কথ না। ‘কী খাইবেন ছার?’ বেশ সংশয়ে দোকানের ছেলেটি জিজ্ঞেস করে। তার ভয় এই পুলিশ আবার টাকা চাইয়া বসে কীনা। আরো ভয় খাওয়া শেষে বিল না দিয়াই চলে যেতে পারে। আমিনুল ভিতরে ঢুকে সবচেয়ে ভালো খাবার গুলোর অর্ডার দিয়ে দেয়। দোকানে দ্বিতীয় কোন খদ্দের নেই। সে খেতে শুরু করে।

বনানী বাজারের এই খাবারের দোকানটায় এর আগেও ফুলি সহ অনেকবার খেয়েছে শফি। সেই সুবাদে দোকানের কর্মচারির সাথে তার সামান্য পরিচয়ও আছে। সেই সামান্য পরিচয়ের ভরসায় আজকে দোকানে এসেছে সে; যদি বাকীতে দোকানের ছেলেটি তারে খাওয়ায়। কিন্তু পুলিশ ছারের খাওয়া নিয়া সে যেমন ব্যস্ত কথাটা তাকে বলাও যাচ্ছে না। অন্যদিন যে সাহসে দোকানে নির্দিধায় প্রবেশ করা ছিল তার স্বাভাবিকতা, আজকে সেই সাহসটি পকেট থেকে হাওয়া। তাই দুই ভাই বোন দাড়িয়ে পুলিশ ছারের খাওয়া দেখছে। এই সময় দোকানের লোকটি তাদের দিকে তাকায়। কর্মচারিটি বেড় হয়ে আসে। ‘কীরে শফি, বাইরে দাড়ায় আছস ক্যান? ভিতরা আয়। খাবি না?’ শফি ভারী অবাক হয়। এই লোক তারে নাম ধইরা ডাকল! তার নাম সে মনে রাখছে! শফি তবুও ভিতরে যায় না। দাড়িয়েই থাকে। আর ফুলি তার হাত ধরে সমানে টানছে ভিতরে যাওয়ার জন্য। টাকা জিনিস টার মাহত্য এখনও তার বুদ্ধির সীমায় আসে নাই। তাই সামনে খাবারের সম্ভার তার ছোট্ট মাথায় রিতিমতন বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে দিল। দোকানের লোকটা তাদের এই পরিস্থিতির কারনটা আঁচ করতে পারে। এমনিতেই আকাশ খারাপ হওয়ার কারণে দোকানে মনে হয় না আজকে আর কোন কাস্টমার আসবে। আর না আসলে অনেক খাবার এমনিতেই তাদের নষ্ঠ হবে আজবে। তাই বলে বসে ‘কীরে ট্যাকা নাই?’ শফি মাথা নাড়িয়ে তার জবাব দেয়। ‘আইচ্ছা যা, আইজ ট্যাকা না দিলেও চলব। পরে আইসা দিয়া যাইস।’ শফির চোখে পানি এসে যায়। এ যেন একুইরিয়াম মাছের নদী আবিস্কার!

শফি’দের কথপোকথন আমিনুলের কানে আসে। তার পাতে তখনো অর্ধেক খাওয়া মুরগীর রান। একপাশে পাংগাস মাছের পেটি। কী মনে করে সে বরে ফেলল ‘বাচ্চা দুইটারে মুরগী আর পাংগাস মাছ দে। ওরা খাউক। আমি দেখি।’ দোকানের লোকটি চাওয়া-চাওয়ি করে। তারপর আমিনুলের অর্ডার দেয়া খাবার গুলো এগিয়ে দেয় শফি’র টেবিলে। একই সঙ্গে মাছ আর মাংস দেখে ফুলি তো চোখ উপরে তুলে আমিনুলকে দেখা শুরু করল। তারপর শুরু করল খাওয়া। বুভুক্ষ মানুষের খাওয়া খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়। খাওয়া শেষে বুড়ির জন্য খাবার প্যাকেট করে নিল তারা। আমিনুলের দিকে মিষ্টি হেসে তারা বিদায় নিল। আকাশের অবস্থা তখন বেশ খারাপ। ‘আজ রাতে ঢাকা শহরের খবর আছে’ আপন মনে বলে আমিনুল। রাতে ভিজতে ভিজতে সে বাসায় পৌছল। তখন রাত ঠিক বারটা। এসময় তার মোবাইল ফোনে অজানা একটা নাম্বার থেকে ফোন এল। আমিনুল ধরতে গ্রাম থেকে ফোন করা ওপাশের চাচা জানাল যে মনসুরের ভাই মারা গেছে। ফোন রেখে দেওয়ার পর সে খালেকের বাসার পাশের ফোনের দোকানের নাম্বারটা বের করে রাখল। সকালে তাকে এই নাম্বারে ফোন দিতে হবে। তার অনেক টাকার দরকার।

সে রাতে প্রবল বর্ষণ হলো। ঢাকা শহরের অনেক রাস্তাঘাট গেল ডুবে। কাগজ কুড়োনিরা যেসব কাগজ পরের দিন কুড়াবে বলে ভেবে রেখেছিল তা গেল ভিজে। কিন্তু তারপর!

তারপর আবারো সকাল হয়। আবারো একটি দিনের জীবন সংগ্রামে নামে প্রতিটি মানুষ তার স্ব-স্ব ক্ষেত্রকে ঘিরে। আর একটি গল্পের জন্ম হয় এই ভাবে।

মিরপুর-ঢাকা

২৫ সেপ্টেম্বর/২০০৪

হৃদয়ে ফাইবার ব্যাকবোন

আজকের দিনটায় বেশ ঝামেলা হবে বোঝা যাচ্ছে। আমি যাব অফিসে কিন্তু মহাখালির এই জ্যামে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এখন অব্দি ৪০ মিনিট শেষ, জানি না আরো কতক্ষন অপেক্ষা করতে হবে। প্রাইভেট ভার্সিটি থেকে বিবিএ পাশ করার পর রীতিমত ‘ফাইট’ দিয়ে এই বছরেই চাকরিটা জোগার করেছি। এখন পর্যন্ত আমাকে চাকরি থেকে সরানোর ব্যপারে আমার উপরওয়ালা চেষ্টায় আছে। একটু ঊনিশ-বিশ হলে আমি শেষ। আমার স্থলে চলে আসবে তার শ্যালক; এতে তার শশুর বাড়িতে সম্মানোত্তিই ঘটবে; মানুষ মাত্রই পরের বাড়িতে নিজের অবস্থান করতেই ব্যস্ত। এই গোপন সত্য অফিসের সবাই জানে। তবে আমার খারাপ যাচ্ছে না। সময়টা কাজেই লাগছে। কিন্তু এই মহা জ্যাম প্রতিদিন চলতে থাকলে মনে হয় না চাকরিটা চালানো সম্ভব হবে। অবশ্য চাকরিটা যে খুব আনন্দ নিয়ে করছি তাও নয়। যদিও মাস শেষে মোট অংকের টাকা পকেটে আসছে ওবুও করতে হয় কিছু একটা, সে জন্যই এই চাকরি। আমার মধ্যে অস্থিরতা খুব বেশি। কোন কাজ একটানা করতে পারি না আর এটাই সম্ভবত আমার জীবনের গতিটা স্বাভাবিক হতে দিবে না। জ্যাম ছুটে গেছে। প্রিমিয়াম বাস চলছে আর এসির শৈত প্রবাহে চোখে মাদকতা সৃষ্টি হচ্ছে। কী জানি এরা এসির সাথে ঘুমের কিছু মিশিয়ে দেয় কিনা! অবশেষে আমি শৈবাল মাহমুদ সকাল ১০ টার অফিস পৌছলাম ১২ টায়। বনানী থেকে ফার্মগেট আসতে খরচ হলো পুরো সোয়া ২ ঘন্টা।

বিকেলে বাসায় বসে গান শুনছিলাম আর কম্পিউটারে ই-মেইল দেখার পায়তারা করছি। এমন সময় বাসার কলিং বেল ফ্যাস ফ্যাস করে উঠল। গত ২ মাস থেকে কলিংবেলের এই হাল। কাজের ছেলেটাকে বলেছিলাম পাল্টাতে, কিন্তু ওর মনে থাকবে না! আর এখন উঠতেও ইচ্ছে করছে না, কিন্তু উপায় নেই। একটু আগে ছেলেটাকে পাঠিয়েছি পেপসি আনার জন্য। বাধ্য হয়ে উঠতেই হলো। দরজা খুলতেই সামনে বিশাল ফুলের তোড়া। শাহেদ আর দীপু দাড়িয়ে আছে। শাহেদ চিটাগাং গিয়েছিল ঘুরতে ও কবে ঢাকা এসেছে একবার ফোন করে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। ওর মুখ দাড়িতে ভর্তি। সাধুবাবা সাধুবাবা অবস্থা। ওর মধ্যে ভবঘুরে ভাবটা আমার থেকেও পাঁচগুণ বেশি। শুধু পার্থক্য হলো আমি কবিতা লেখি আর ও লেখে না।

-‘শ্যাওলা মিয়া ফুলগুলা ধরো। ১৫০ টাকা দিয়া কিনছি। ফুল কিনতে গিয়া পকেটের সব টাকা শেষ। এখন আমারে ৫০০ টাকা লোন দেও।’ কথাগুলো এক নিশ্বাসে দীপু বলে ফেলল। দীপুর এই এক দোষ: কথা আস্তে বলতে পারে না এবং কথার মধ্যে কোন বাহুল্য নাই। আর এই দুইজন আমার নামের অর্থ শৈবাল থেকে করেছে শ্যাওলা। অবশ্য ইদানিং এদের মুখে হঠাৎ শৈবাল শব্দটা শুনলে নিজেই চমকে উঠি। আমি আসলে শ্যাওলা নামটাকেই বেশি পছন্দ করি। কিন্তু তা প্রকাশ করি না।

-‘ফুলের জন্য ধন্যবাদ দেওয়া লাগবে নাকি? তোদের তো দিয়া দিয়া আমি শেষ হইয়া গেলাম। এখন বাকী আছে খালি থ্যাংকস।’ কথাটা বলে আমি হাসতে লাগলাম। আমি কখনোই এই দুই বন্ধুর জন্য প্রাণ খুলে কিছু খরচ করতে পারিনি। বরং ওরাই আমার জন্য অনেক কিছু করেছে। এমনকি আমি এই যে দুই রুমের বাসাটা নিয়ে আছি তাও দীপুর খালার বদৌলতে। এত কম টাকায় বনানীতে কেউ বাসা ভারা দেবে না। আজকে আমার জন্মদিন। আমি জানতাম কেউ আমাকে উইশ করবে না। কিন্তু এই দুই জনের কথা আলাদা। আমার জন্য এরা ‘বন্ধু অন্ত প্রাণ’।

-‘এখন এতো কথা কওনের কাম নাই। চলো, শার্ট টা গায়ে দেও, আমাদের খাওয়াইবা। পিজা হাটের পিজা আমরা আইজ খামু, ট্যাকা বাইর করো মামু- বলেই হাসতে থাকে সে। নিজের কাব্য প্রতিভায় মুগ্ধ।’ আমি দ্রুত তৈরি হয়ে নেই। বেশি দেরি করলে উল্টা আমাকে এরা খালি গায়েই নীচে নামাতে পারে। দীপুর মাথার কোনো ঠিক ঠিকানা নাই।

নীচে দীপুর টয়োটা মার্ক-২ দাড় করানো। ওরা দুইজন সামনে আর আমি বরাবরের মতোন পিছনে। দীপু আমার জন্য কখনো গাড়িতে সিগারেট খায়না। আমার এজমার সমস্যার কথা চিন্তা করে দীপু তার এই প্রিয় কাজটা করে না। বেচারা মনে হয় খুব কষ্ট পায়। শুনেছি সিগারেটের নেশা, সব নেশার থেকে ভয়ঙ্কর। দীপু খোশ মেজাজেই গাড়ি চালাচ্ছে। আজকে গাড়ির গতি বেশ কম। স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ডের এটিএম মেশিনের সামনে দীপু গাড়ি থামিয়ে ভিতরে গেল কিছুক্ষন পর  ফিরে এলো। গাড়িতে এসেই বলল ‘পিজা হাট কেনসেল। জন্মদিনের দিন এই কবি শালার পেটে পিজা সহ্য হবে না। এরে বাঙালী খাবারের দোকানে নিতে হবে।’ শাহেদ মাথা দুলিয়ে হাসতে লাগল। ও হাসলে মাথা পেন্ডুলামের মতোন দুলতে থাকে। হাসতে হাসতে যোগ করল ‘ওরে টাকি মাছের ভর্তা, শুটকি ভর্তা, আলু ভর্তার দোকানে নিয়া যা। আর বাবুর্চিরে স্পেশাল ইন্সট্রাকশন দিয়া বেশি করে ঝাল দিতে ক। পরের দিন সকালে শালায় বাথরুম থাইকা আসলে বাংলা সাহিত্যে ঝালের একখান কবিতা যোগ হবেই, আমার কোন সন্দেহ নাই।’ এই কথায় আমরা সবাই হাসতে লাগলাম। আমাদের এই হাসির শব্দে রাস্তার ধারের এক চাচমিয়া বির বির করে উঠল। পিছনে তাকায়ে দেখি কেমন করে যেন চেয়ে আছে। ভাবছে বুঝি ‘বড়লোকের পোলাপানরা সব গেছে!’ দীপু গাড়ি দাড় করালো ‘রসনা বিলাসে’। এদের খাবার এর আগেও আমরা এক সাথে খেয়েছি। রূপচান্দার আইটেম এদের অস্বাধারণ হয়। সন্ধ্যার পর অব্দি আমাদের ভোজন পর্ব চলল। আরো কিছুক্ষন থাকা যেত কিন্তু শাহেদের জন্য থাকা গেল না। শাহেদের টার্ম ফাইনাল সামনে। চিটাগাংয়ে অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে। এখন আর সময় নষ্ট করলে নাকি বুয়েট পাশ করতে পারবে না। শাহেদ এবার মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর শেষ বর্ষে। তাকে যেতে হবে আজিমপুর। ‘বালের পরীক্ষায় আমার লাইফ হেল বানায়ে দিবে। শালার কোন দুক্ষে যে বুয়েটে ভর্তি হইছিলাম!’-শাহেদ আক্ষেপ করে। আমরা উঠলাম। বরাবরের মতোন বিল দিল দীপু। আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে গাড়ি থেকে গলা বাড়িয়ে দীপু বলল ‘কালকে বাসায় আসিস পারলে, মা তোরে ডাকছে।’ আমি হাত নাড়লাম। বিদায় পর্বটা হলো খুবই সংক্ষিপ্ত।

 

চারতলা সিড়ি ভেঙে ছাদের মধ্যে আমার দুই রুমের বাসা। সামনে খোলা ছাদ। রাতে হাটাহাটি করা যায়। ঘরে ঢুকে দেখি ছোট্ট রান্নাঘরে কাজের ছেলেটা রান্না চাপিয়েছে। আমি আর তাকালাম নাÑকী রান্না করছে সেটা দেখার জন্য। ঘরে ঢুকে কম্পিউটার অন করে মেইল দেখা শুরু করলাম। আমার ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেকশন। তাই কম্পিউটার অন করলেই ইন্টারনেট পাওয়া যায়। নতুন কোন মেইল নেই। শুধু ইয়াহু ক্যালেন্ডার সার্ভিস থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাঠিয়েছে। যদিও পুরো মেইলটাই কম্পিউটার প্রগ্রাম দিয়ে তৈরি, তারপরেও ভালো লাগল। সময় কাটানোর জন্য চ্যাট-আড্ডার সিদ্ধান্ত নিলাম। তাছাড়া আজকে আমার জন্মদিন, কারো সঙ্গে কথা বললে খারাপ হয় না। আইআরসি১ ডাল নেটে২ সংযুক্ত হলাম। আজ মনটা বেশ ভালো তার উপরে জন্মদিন, তাই প্রতিদিনের কমন নাম ‘শ্যাওলা কবি’ না নিয়ে নিলাম ‘ভবঘুরে মেঘ’। তারপর ঘুকে গেলাম বাংলাদেশ রুমে৩। আজকে রুমে মনে হয় কোন ঝগড়া চলছিল। কারণ রুমের মেইন পর্দায় লেখালেখির কায়দা বন্ধ করে রাখা আছে। আমার প্রতি ব্যক্তিগত বার্তা এলো। রোখসানা নামের কেউ বার্তাটি দিয়েছে। শুধুই ‘হাই’ যার জবাবে আমি লিখলাম ‘হ্যালো’। এরপর আমাকে লিখল ‘নামটা তো বেশ সুন্দর, কবি নাকি?’ জবাবে লিখলাম ‘এই দেশে কাক আর কবির সংখ্যা নিয়ে তো একটা বিতর্ক আছেই। কারো মতে কাকের সংখ্যা বেশি আর কারো মতে কবির। তা সেই ধারায় আমিও কবি। মানে কবিতা লেখার চেষ্টা করি।’ ‘তাহলে একটা কবি শোনান। অনেকদিন কবিতা শোনা হয় না।’ জবাবে লিখলাম ‘ভ্রমরীর মতো চুপে সৃজনের ছায়াধূপে ঘুরে মরে মন/আমি নিদালির আঁখি, নেশাখোর চোখের স্বপন!/নিরালায় সুর সাধি, বাঁধি মোর মানসীর বেণী,/মানুষ দেখেনি মোরে কোনদিন, আমারে চেনেনি!’ জীবনানন্দ দাশের ‘কবি’ ঝাড়া মুখস্ত লিখে গেলাম। এরপর অনেক্ষন কোন জাবাব নেই ওই প্রান্ত থেকে। অবশেষে সে লিখল ‘খুব ভালো লাগল কবিতাটা। খুবই সুন্দর, কেমন যেন হাহাকার, মাথা তচনচ করে দেয়। কবে লিখছেন এটা? আমি বললাম ‘এটা জীবনানন্দ দাশের কবিতা। আমার না।’ ওপারের মানুষটি বলে ‘আপনার নিজের কোন কবিতা নেই? তবে যাই হোক কবিতাটা আমার ভালো লেগেছে। আমি জীবনানন্দের সব কবিতা পড়ি নাই। তাই বুঝতে পারিনি। আপনার কবিতা শোনান। আমি লিখলাম, ‘ভালোবেসে হেসে হেসে/আমিও যাব মিশে/কোন একদিন,/রবে শুধু ছায়ার মতোন/ভালোবাসা অরূপরতন/আমি প্রতিদিন।’ ‘বাঃ এটা আপনার কবিতা! খুব ভালো। কিন্তু এখানেও কেমন যেন দুঃখ। কবিতায় এতো হাহাকার কেন? আনন্দের কোন কবিতা জানেন না?’ আমি লিখলাম, ‘আমি সবসময় উল্টা কাজ করি তো তাই আনন্দের দিনে আমি দুঃখের কবিতা পড়ি। এতে আমি বেশ ব্যালান্সে থাকি।’ ‘তো কী এমন আনন্দের ঘটনা ঘটেছে আজকে?’ আমি বললাম, ‘আজ আমার জন্মদিন’। ‘ওয়াও। শুভ জন্মদিন।’ এর জবাবে আমি তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলাম। তাকে জানিয়ে দিলাম আমার নাম শ্যাওলা, থাকি বনানী, একটা প্রাইভেট কোম্পানিকে কাজ করি। মার্কেটিং অফিসার। সে জানালো তার নাম রোখাসানা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত রসায়ন বিভাগে প্রথম বর্ষে পড়ে সে। থাকে আজিমপুর। আগে তারা বনানীতেই ছিল। ৭ নম্বর রাস্তায়। আমি শুনলাম। কবিতা নিয়ে মেয়েটির ভালোবাসা আছে তা বুঝতে পারলাম। অবশেষে আমরা ইমেইল ঠিকানা আদান প্রদান করলাম। আজকের মতোন আলাপ শেষ হলো। বিদায় নিলাম চ্যাট রুম থেকে।

 

আজকে অফিসে গিয়েই সবার প্রথম আমার মেইল চেক করতে বসলাম। মেইল বক্সে রোখসানা ইয়াসমিনের কাছ থেকে একটি মেইল এসেছে। খুললাম। পড়লাম। আবারো পড়লাম। আমার চোখে স্বপ্ন খেলা করছে। কী যে ভালো লাগছে। একই বলে বুঝি নিজেরে হারায়ে আবারো আবিষ্কার। এরই নাম বুঝি স্বপ্নের বাস্তবে পা দেয়া। মেয়েটি আমার কবিতার প্রতি তার স্বপ্নকে জুড়ে দিয়ে বিশাল চিঠি লিখেছে। আরো বলেছে আজকে বিকেল ৫ টায় যেন অবশ্যই চ্যাট রুমে থাকি। আজ আমি অফিস করছি বেশ ঘোরের মধ্যে। কোন কাজ মাথায় আসছে না। আমার এই অবস্থা দেখে মুর্শিদ সাহেব আমাকে বাসায় যেতে বললেন। মুর্শিদ সাহেব আমার উর্ধতন কর্মকর্তা। তার কথা শুনতেই হলো। বাসায় এসেই চ্যাট রুমে ঢুকে বসেই রইলাম। চেয়ার থেকে উঠলাম না। মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিলাম, যাতে কেউ বিরক্ত করতে না পারে। ৫ টা বাজে, তবু সে আসছে না। আমি বসে আসি শকুনের মতোন। শেষ পর্যন্ত সে এলো। দেরির কারণ ভার্সিটি থেকে দেরিতে ফেরা আর ইন্টারনেটের সংযোগ পেতে সমস্যা। আমরা কথা শুরু করলাম। আমার স্বপ্নের কথা বললাম। যে স্বপ্নগুলোকে শাহেদ এবং দীপু পাগলামি ছাড়া আর কিছুই মানতে রাজি নয়, সেগুলো সব বললাম। মেয়েটি আমার স্বপ্নের সাথে তার স্বপ্নের নৌকা ভাসালো। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথে আমাদের স্বপ্ন ভেসে বেড়াতে থাকল।

 

প্রতিদিন অফিসের ফোনে সে ফোন করে, আমরা কথা বলি। কোন দিনো মোবাইল ফোনে সে ফোন করে না। এমনকি মোবাইল নাম্বার পর্যন্ত নিতে তার আগ্রহ নেই। খারাপ যাচ্ছে না। প্রতিদিন অফিসে যাই। বিকেলে বাসায় এসে নাস্তা খেয়ে রোখসানার সাথে চ্যাট করি। আমার কবিতার খাতা থেকে ওকে কবিতা শোনাই। জীবনানন্দের বই থেকে কবিতা পড়ি। ও শোনে। বাড়াবাড়ি রকমের উচ্ছাস প্রকাশ করে। ফলতঃ আমার স্বপ্নের গাঁথুনি পাকাপোক্ত হতে থাকে। যার মনে কবিতা লেখার ঝোক তার তো এমন মানুষ পছন্দ হবেই। এই রুটিনে এক মাস চলে গেল। এই সময়ে শাহেদ এবং দীপুর সাথে দেখা হয়নি। শুধু ফোনেই যোগাযোগটা অক্ষুণœ আছে।

 

একমাস পরের কথা। রোখসানার কাছে আমি ওর ছবি চাইলাম। ও বলে ‘ছবি তো দিতে পারব না। ভাইয়ার নিষেধ আছে। তাছাড়া আমার ছবি স্ক্যান করা নেই। আমি আপনাকে ছবি দিতে পারব, কিছুদিন পর।’ ‘তোমার ভাইয়া তো পীর বাবা হয়ে গেছে। এতো পণ্ডিতি করে কেনো?’- আমি লিখলাম। সে লিখল ‘পণ্ডিতি তো করবেই। ভাইয়া খুব ভালো ছাত্র। এবার মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে। বুয়েটে আছে।’ আমি আর কী বলি! অভিমান করে চ্যাট রুম থেকে বেড় হয়ে যাই। পরের দিন শুক্রবার। অফিস বন্ধ। মনের মধ্যে অভিমানের বোঝা। তাই বেড় হলাম শাহেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে, ওর মা সংবাদ দিয়েছে। শুক্রবার তাই রাস্তাঘাট ফাকা। আজিমপুর যেতে বেশি সময় লাগল না। শাহেদদের ফ্লাট ৩ তলায়। বেল দিলাম। দরজা খুলে দিল শান্তা, শাহেদের বোন। ‘কেমন আছো শান্তা? সব খবর ভালো?’ শান্তা সভাব সুলভ মিষ্টি করে হাসল, কিছু বলল না। ‘শাহেদ কোথায়? ওকে ডাক দাও আর আমাকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খাওয়াও।’ শান্তা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল ‘আচ্ছা’। আমার শরীর রিন রিন করে উঠে। রোখসানার সাথে মিল আছে গলার। হয়তো মনের ভুল। রোখসানার কথা সব সময় ভাবি তাই হয়তো সবার গলা তার মতোন মনে হয়। শাহেদ এলো, সঙ্গে তার মা। আমি দাড়িয়ে সালাম দিলাম। শাহেদের মা আমাকে বসতে বললেন। আমি বসলাম। শান্তা পানির গ্লাস নিয়ে সামনে দাড়ালো পানির গ্লাস নিতে গিয়ে তার চোখের দিকে তাকালাম। অপূর্ব সুন্দর সে চোখ। ডাগর ডাগর চোখে রাজ্যের সরলতা। চোখের মধ্যে যেন নিসর্গ আঁকা আছে শিল্পীর তুলি দিয়ে। আমি পানি শেষ করলে শান্তা চলে গেল। শান্তা কোন দিনও কথা বলে না। লক্ষী সভাবের মেয়ে। এমন ভালো মেয়েকে যে ঘরে পাবে তার ভাগ্যের কথা চিন্তা করে হিংসা লাগে রিতিমতন। শাহেদের মা জানালেন আসল খবর। শান্তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। ছেলে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। চিটাগাংয়ে বাড়ি। আমি খুবই খুশি হয়ে উঠি। যোগ্য পাত্রই পাওয়া গেছে। আমাকে দিয়ে বিয়ের কার্ডের দাওয়াতপত্রের লে-আউট করানোর ইচ্ছে। আমি আরো খুশি হয়ে উঠি। শান্তার মতোন লক্ষী মেয়ে তার উপর শাহেদের বোন। এর বিয়ের কার্ডের দায়িত্ব নিতে আমার আনন্দ হওয়ারি কথা। বর পক্ষ, কনে পক্ষের সমস্ত কিছু কাগজে লিকে দিতে বললাম। শাহেদ তা আমার পকেটে ঢুকিয়ে দিল। বাসায় ফিরলাম তাড়াতাড়ি।

 

আমার পৃথিবী অন্ধকার। বাড়িঘর সব দুলছে। শুধু মনে হচ্ছে আমি চেয়ার থেকে গড়িয়ে পরে যাচ্ছি। চেয়ারে ঘুমিয়ে পরে ঘুম ভাঙার সময় যেরকম অনুভূতি হয় অনেকটা সেরকম অনুভূতি হচ্ছে। আমি দেখছি কনের পরিচিতি। কনের নাম রোখসানা ইয়াসমিন (শান্তা)। ফলিত রসায়ন, প্রথম বর্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমার ক্ষণ-ধৈর্য-স্বভাব এবং উদাসিন্য কোন দিন কোন কিছু জানার আগ্রহ তৈরি করে নি শাহেদদের বাসার মানুষদের সম্পর্কে। আমি শুধু শাহেদ আর দীপুরই খবরই রাখতাম। সে রাতেই আমি খুলনা রওনা হলাম, আমার বাড়ি। যাওয়ার আগে দীপুকে ফোন করে বললাম, ‘শাহেদকে বলিস গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাড়িতে যাচিছ। তাই বিয়ের কার্ডের কাজটা করতে পারলাম না।’

 

১১ দিন খুলনায় কাটানোর পর আজ সকালে ঢাকায় ফিরেছি। আজকে শান্তার বিয়ের অনুষ্ঠান। গতকাল চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে আমাকে, জেনেছি মোবাইলে। আমি চুপ চাপ বন্ধ কম্পিউটার স্ক্রীণের দিকে তাকিয়ে আছি। দুুুুপুরের একটু আগে দীপু এলো। ‘ওই শালা কবির বাচ্চা। আইজ শান্তার বিয়ার অনুষ্ঠান আর তুমি শালা থাকো খুলনা। আমি আর শাহেদ দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া ফুল প্যান্টরে হাফপ্যান্ট বানায়া ফালাইলাম আর তুমি এখনো বইসা আছো?’ আমি ম্লান হাসলাম। আমার চোখের নীচে কালি। দীপুর এসব নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। ‘দীপু আমারে একটা র‌্যাপিং পেপার আইনা দেতো।’ দীপু পেপার আনতে গেল বিনা বাক্য ব্যায়ে। দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই জীবনানন্দ দাশের কাব্যসংগ্রহ আমার হাতে, যেটি থেকে শান্তাকে রাত জেগে জেগে কবিতা শোনাতাম, তার প্রথম পাতায় লিখলাম, ‘আমিও যাব মিশে/কোন একদিন।/তোমার হাতের পরে অন্য একটি হাত।’ দীপু ফিরে এসেছে। আমাকে সাহায্য করছে বইটা সুন্দর করে প্যাক করতে। দুপুরে দু’জনে বেড় হলাম ধানমন্ডির পার্টিপ্যালেস কমিউনিটি সেন্টারের উদ্দেশ্যে। সেখানে আজ অনেক বেশি হৈচৈ। বইয়ের প্যাকেট টা হাতে নিয়ে কনের স্টেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি স্থির চোখে। খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে শান্তাকে। চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। প্যাকেটটি হাতে তুলে দিলাম হাতে; আমার হদয়তান্ত্রিক নিউরাল নেটওয়ার্ক ডিসকানেক্ট হলো। আর দাড়াই না। হাটা শুরু করি। বুকের ভেতর নিরো তার বাঁশি বাজানো শরু করেছে; কিছু একটা ধবংস তো হবেই। ফাইবার অপটিকে ভেসে বেড়ানো আমার ব্যকুলতা ইন্টারনেট বুঝুক বসে বসে, কোন দায় নেই আমার।

 

 

 

 

পরিশিষ্ট্য

১। আইআরসি (IRC-Internet Relay Chat)-ইন্টারনেটে কোন একটা সার্ভার নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে আড্ডা দেয়ার বিশেষ সার্ভিস।

২। ডাল নেট (DAL NET-www.dal.net)-ইন্টারনেটে আড্ডা দেয়ার সবচেয়ে বড় সার্ভার নেটওয়ার্ক।

৩। চ্যাট রুম-আড্ডা দেয়ার সার্ভার নেটওয়ার্কে নির্দিষ্ট কোন স্থান। যেখানে রুমের বৈশিষ্ট অনুযায়ি লোকজন প্রবেশ করে আড্ড দেয়। সাধারণত এই রুমগুলোর নাম দেশের নামে হয়ে থাকে যাতে সেই দেশের লোকজন একখানে প্রবেশ করে আলাপ জমাতে পারে।