রূপকথা আজকে ৯ বছর

মানুষের জন্মের প্রক্রিয়াটি বেশ মজার। পুরো অনিশ্চিয়তায় ভরা একটা সিনেমার নাম মানুষের জন্ম। একটা মাত্র শুক্রাণু সুযোগ পায় গর্ভধারণের প্রক্রিয়াতে। অথচ কয়েক লক্ষ্য শুক্রাণু অংশগ্রহণ করে সেই যাত্রায়। এই কয়েক লক্ষ্য শুক্রাণুর কয়েক লক্ষ্য সম্ভাবনা। একটির জায়গায় আর একটি হয়ে গেলে জন্ম নেয়া মানুষটির স্বভাব এবং চালচলনের পার্থক্য হয়ে যেত। এই অদ্ভুত অনিশ্চিয়তার খেলা শেষে মানব সন্তানেরা জন্ম নেয়। আমিও নিয়েছিলাম। আমার জন্ম সেই ১৯৮০ সালের ২১জুন, সকাল ১১:৫৫ মিনিটে, বাংলায় আষাঢ়ের ৭। বৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল কুড়িগ্রামের রাঙালীরবস গ্রামে। আমাদের বাড়ি ভারতের আসাম রাজ্যেই পাশেই। অথচ সেদিন ছিল গগন ফাঁটা রোদ। পিচঢালা পথ হলে নির্ঘাৎ জুতোর মধ্যে তা উঠে আসত। পিচের পথ সেই সময় ছিল না। কাদামাখা মেঠোপথ ধরে আমাদের আত্মীয়-স্বজনেরা জড়ো হয়েছিলেন আমার জন্মের স্বাক্ষী হতে।

অরুন্ধতী রূপকথা, আমার একমাত্র সন্তান

আমার জন্ম হলো একরকম মৃত অবস্থায়। আমার শ্বাসপ্রশ্বাস ছিল না কয়েক মিনিট ধরে। ড: মজিবর রহমান, এম.বি.বি.এস তখন রায়গঞ্জ হাসপাতালের ডাক্তার। ডাক্তারের প্রজ্ঞায় আমার আবার নিশ্বাস ফিরে আসে। আসলে এই ঘটনা আমার আত্মীয় স্বজনেরা যখন বলেন, তখন অনেক মজার হয়। জানতে পারি সেদিন ফুলকুমার নদী পার হতে গিয়ে কারা কারা পানিতে পরে গিয়েছিলেন। জানা যায় আমার দুই দাদী কেমন মাতম করে কাঁদছিলেন। আমার একমাত্র চাচা কেমন করে বাড়ির চারপাশে কাঁদতে কাঁদতে চক্রাকারে ঘুরছিলেন। এইসব গল্প আমার শৈশবে শোনা। ছোটবেলা থেকেই নিজেকে খুব স্পেশাল ভাবতে শিখেছি এই ঘটনা থেকেই।

আমার জন্মের কথা আয়োজন করে লিখলাম এতদিন পরে। জন্মের পর আমাকে দেখে আমার ডাক নাম রাখলেন আমার দাদী। সেই নাম হলো ননী। আমি ননীর মতোন ফর্সা ছিলাম। এমনকি সবাই ভাবত আমি কোন মানুষের বাচ্চাই না! এখনো আমার কিছু আত্মীয়-স্বজন আমাকে ননী নামে ডাকে। এমনকি স্কুলের বন্ধুরাও। কিন্তু এই নামটি একটা কারণে ঢাকা পরে গেল। আকিকাতে নাম রাখা হলো মো: লুৎফর রহমান। ডা: লুৎফর রহমানের সাথে মিল রেখে এই নাম রাখলেন আমার দাদাজান, খলিলুর রহমান ব্যাপারী। ব্যপারী আমাদের পারিবারিক নাম। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় সেন্টার পরীক্ষা নামের একটা পরীক্ষা ছিল ১৯৯০ সালে। সেই সার্টিফিকেটে আমার নাম মো: লুৎফর রহমান ব্যাপারী। এই নাম থেকে লুৎফর রহমান নির্ঝর হওয়ার গল্পটাও বেশ মজার। এই গল্পটা অনেক নারীবাদি একটা গল্প।

অজপারাগাঁ শব্দটা আমাদের গ্রামের জন্য প্রযোজ্য। প্রত্যন্ত অঞ্চল। কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জ ইউনিয়নের রাঙালীরবস গ্রামে। ছোটবেলায় যাতায়াতের জন্য ছিল মহিশের গাড়ি। মোটর সাইকেল ছিল বাবার। গ্রামের কাদামাখা রাস্তায় মোটারসাইকেল চালাতে হলে হতে হবে অনেক দক্ষ। মোটরসাইকেল পিছলে পরা ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। সেই গ্রামে বিয়ে করে আমার মা এলেন।

পূর্বপুরুষদের জমিদারি ব্যবসা নেই। কিন্তু জমিদারি প্রথা লোপ পাওয়ার পরেও অনেক জমি। এই জমিতে কী করতে হবে, সেই ধারণা অস্পষ্ট। তখনো ইরি ধানের প্রচলন হয় নি। সেই অস্থির সময়ে বাবা পারিবারের হাল ধরলেন এবং বিয়ে করলেন ১৯৭৯ সালের ২১শে জুলাই। মা তখন সরকারি চাকরি করেন। পরিবার পরিকল্পণা অধিদপ্তরের মাঠ সমন্বয় কর্মী। এখানে বলার অপেক্ষা রাখে না যে পুরুষতন্ত্র সেই সময়ে কতটা কঠিন ছিল।

একটা শিশুর জন্ম হলো। একটা মায়ের প্রথম সন্তান। অথচ সেই মায়ের সন্তানের কোন কিছুতে কিছু বলার অধিকার থাকল না। মুসলিম পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে নামকরণ থেকে সবকিছু অধিকার করলেন দাদাজান এবং দাদী। আমার নাম নিয়ে মায়ের ইচ্ছের কথাটা আমাকে শুনতে হলো আমার বয়স যখন ১৯ তখন। সালটা ১৯৯৯।

একদিন মা অনেক দুঃখ করে জানালেন এই পরিবারে তার কোন ইচ্ছেই কোনদিন পূরণ হয় নি। এমনকি নিজের বাচ্চার নামটা পর্যন্ত তিনি রাখতে পারেন নি। তখন তিনি জানালেন তার ছেলের নাম তিনি রাখতে চেয়েছিলেন নির্ঝর। শুধু ডাকনামটুকু। কথাগুলো বলতে গিয়ে মা কেঁদে ফেললেন। আর আমি! আমি তখন পুরোদস্তুর কবি। মানে কবিতা লিখি, কাধে শান্তিনিকেতন মার্কা ব্যাগ, পাঞ্জাবী। বেশ কায়দা করে চলি। অন্যরকম ব্যাপার। সেদিন মাকে বলেছিলাম তার দেয়া নামটাই আমি প্রতিষ্ঠিত করব। সত্যিকার অর্থে সেটাই ছিল আমার প্রথম নারীবাদি চর্চা।

আমার মা সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ বই পড়তে পছন্দ করেন তা শুনলে এবং দেখলে অনেকেই চোখ কপালে তুলে ফেলবেন। মায়ের পড়াশুনা করার এই অভ্যাস আমরা সবাই পেয়েছি। এমনকি আমার তিন বোন এবং মায়ের সাথে যখন আড্ডা দেই, বাইরের কেউ সেই আড্ডা বুঝতে পারবেন না। অনেকটা কোডেড ভাষা। বিভিন্ন বইয়ের ক্যারেক্টারের ভাষায় আমরা কথা বলি।

আজ ৫ ই নভেম্বর। আমার একমাত্র কন্যার জন্মদিন। আমার কন্যা অরুন্ধতী রূপকথার আজ ৯ বছর পূর্ণ হলো। আমার মেয়েকে নিয়ে অনেক গল্প করার কিছু নেই। কন্যা আমার সাথে থাকে না। তার মায়ের সাথে মালয়েশিয়ায় থাকে। আমি তাকে দেখেছিলাম তার ১০ মাস বয়সে। তার বন্ধুরা গোপনে ফেইসবুক থেকে ছবি চুরি করে পাঠায়। আমি তার ছবি, তার আঁকা-আঁকি নিয়ে থাকি। স্বার্থক মানব জনম!

নভেম্বর নামা

নভেম্বর মাস এখনো আসে নি। আসি আসি করছে। নভেম্বর মানেই নভেম্বর ৫। এই ৫ তারিখ আসছে ভাবলেই মনটা খারাপ হতে থাকে। নানাভাবে ভুলে থাকি কিন্তু একটা এলার্ম অলক্ষ্যে টিকটিক করে। ২০১০ সালে সেই দিন আমার মেয়ের জন্ম।

আমাকে যারা চেনেন, সবসময় ভুলে যান যে আমার প্রায় নয় বছর বয়সী একটা ফুটফুটে মেয়ে আছে। মেয়ের নাম রূপকথা। অরুন্ধতী রূপকথা। গত আট বছর আমার মেয়েকে দেখি নি। এটা একটা বেদনার মহাকাব্য।

ছবিটা আমার মেয়ের কালা করা। ৪ বছর বয়সের। তার মায়ে ফেসবুক থেকে চুরি করেছিলাম।

গত কয়েকদিন থেকেই ভাবছি নভেম্বরের লেখা। এটা একটা অবধারিত লেখা। ভাবছিলাম যেদিন রূপকথার সাথে দেখা হবে, কী বলব তাকে? কী গল্প করব? গল্প কী শুরু করব এই ভাবে “আমি যখন তোমার বয়সী ছিলাম!” দিয়ে।

আমি যখন ৯ বছর, তখন কুড়িগ্রাম তো অনেক সবুজ। আমাদের গ্রামটা তখনও অনেক বড়। এখনও আয়তনে আগের সমানই আছে, কিন্তু শৈশবের স্থান বরাবরেই অনেক উন্নত আর বিশাল। বয়সের ক্রমে সবকিছুকে ছোট করতে শিখি অথবা বলা যেতে পারে চিন্তার পরিসর ছোট হয়। নষ্ট সময়ের আক্ষেপ নিয়ে বেঁচে থাকা।

আমার ৯ বছরে আমি চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি। রায়গঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম। আমাদের স্কুলে সামনে বিশাল মাঠ ছিল। সেই মাঠ এখনও আছে। পড়ার ফাঁকে একটাই কাজ ছিল, ফুটবল নিয়ে মাঠে পড়ে থাকা। বর্তমানের এই পান্ডার মতো শরীর যারা দেখে অভ্যস্ত তাদের কল্পনাসীমাতে কখনই আসবে না যে একসময় আমি ফুটবলার ছিলাম। আশ্চর্যজনকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পর্যন্ত ফুটবলটাই খেলেছি। ক্রিকেট আমার প্রিয় খেলা কখনই ছিল না। একটা শৈশব ফুটবল নিয়ে ছুটেছি বললে একদম বাড়িয়ে বলা হবে না।

প্রতিদিন স্কুলে যেতাম। ফুটবল খেলা না হলে (শিক্ষকরা মাঝে মাঝে খেলতে দিতেন না) মেয়েেদর সাথে ছি, কুতকুতও খেলতাম। আসলে সেই বয়সে গ্রামের ছেলেমেয়েদের জেন্ডার সেন্স থাকত না। ছেলেমেয়েদের সাথে কত বিচিত্র খেলা যে খেলেছি সেটা লিখতে গেলে বড় একটা উপাখ্যান হয়ে যাবে।

স্কুল শেষে বাড়িতে ফিরে আবারও ফুটবল নিয়ে কাজ। আসলে আমাদের বিশাল পরিবারের সবাই ফুটবলার। আমার বাবা ফুটবলার ছিলেন, দাদাও ফুটবলার ছিলেন। আমার চাচাতো বাই রেজাউল দীর্ঘদিন মোহামেডানে খেলেছেন এবং বেশ কয়েকবছর সেই দলের ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেছেন। আর ছোটবেলায় সবাই একসাথে ফুটবল খেলেই বড় হয়েছি। পাড়ায় পাড়ায় ফুটবল হলে আমাদের সাথে খেলতে কারো আগ্রহ বিশেষ থাকত না। আমাদে ফুটবল দল মানেই আমাদে পরিবার। একদম পারিবারিক দল এবং সবাই জেলার অন্যতম বড় খেলোয়ার।

বিশেষ ঘটনা ঘটত বর্ষার শুরুতে। প্রথম বৃষ্টির সময় যখন আকাশ কালো হয়ে আসত এক দৌড়ে চলে যেতাম বাড়ির পিছনের শেষ সীমানায়, যেখানে অনেকটা প্রান্তরের মতো খোলা আকাশ, আকাশের নীচে সবুজে ছাওয়া খেত। খেতের শেষেই ফুলকুমার নদী। কালো মেঘের থমথমে ভাবের সাথে এক চিলতে আলো বেড় হতো শেষ সীমানায়। সেই অদ্ভুত ঘোর লাগা আলো আমার অতি প্রিয়। বাংলার প্রাকৃতিক রূপের যদি কোন তালিকা করি, প্রথম বর্ষনের আগের মূহুর্ত হবে আমার প্রথম প্রিয় বিষয়।

কুড়িগ্রামে বৃষ্টি হতো অবিরত। একবার বৃষ্টি শুরু হলে আর থামত না। দিনের পর দিন বৃষ্টি। বৃষ্টি হলে স্কুলে আর যেতাম না। যাওয়ার দরকারও ছিল না। নদীতে নতুন পানি, খালে পানি, পুকুর থৈথৈ করা। আর পানি মানেই মাছ। কত রকম উপায়ে যে মাছ ধরতে পারতাম! নিজের শৈশবের কথা চিন্তা করলে নিজেই আর বিশ্বাস করি না।

আমার সন্তান রূপকথাকে সত্যিকারের রূপকথা শোনাব। এখনকার বাচ্চাদের কাছে আমাদের শৈশবকে রূপকথার মতোই শোনাবে।

মায়ের সাথে চৈত্রসংক্রান্তি

মা বেড়াতে এসেছেন আমার সাথে পহেলা বৈশাখ কাটাবে বলে। সাথে নিয়ে এসেছে গাছের পাকা পেপে আর ঘরের মুরগি (আসলে মোরগ)। মোরগ রান্না করেই এনেছেন, আমার মাথায় ঢুকে গেছে যে ঢাকায় রান্না করলে সেই রান্নার আর বাড়ির রান্নার মতো মজার হয় না। খুব সকালে মা আসার পর দুপুর থেকে খেয়েই চলেছি। এক দিনে মোটামুটি আমার ওজন ২.৫ কেজি বেড়ে গেছে। কোন আফসোস নাই।

চৈত্রের শেষ দিবসে চারুকলা

আমরা ৪ ভাইবোন। আমি সবার বড় এবং একমাত্র ছেলে। ভাইবোনেরা মিলে অনেকবার মা’কে বলেছে ঢাকায় এসে থাকতে। কিন্তু আব্বা মারা যাওয়ার পর মা আরো বেশী ব্যস্তা হয়ে পড়েছেন। ঢাকায় আসার বিষয়ে অবশ্য কোন যুক্তিও দিতে পারি না। পৃথিবীর কোন পাগল ৫০ বিঘা আয়তনের বাড়ি ছেড়ে ঢাকার ২০০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে এসে থাকবে! তবুও মা আসে। আমি ঘ্যানঘ্যান করি, বোনেরা ঘ্যানঘ্যান করে।

ঢাকা বাতিঘরে মা। চৈতসংক্রান্তির দিন।

যেহেতু মা এসেছেন ঢাকার নববর্ষ দেখতে তাই বিকেলে বের হয়েছিলাম শাহবাগ এবং চারুকলায় যাওয়ার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল নুসরাতের জন্য সবার সাথে দাঁড়াতে। কিন্তু হঠাৎ এলো বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যেই মা, ইমন ভাই (Imtiaz Mahmood) সহ চারুকলার বকুল তলায় গাড়ি পার্ক করে বসে রইলাম। বৃষ্টি থামে না। মা’র অবশ্য সমস্যা হয় নি। বৃষ্টি পড়লেই তার মন ভালো হয়ে যায়। অনেকক্ষণ থাকার পর আমরা বাতিঘরে গেলাম। অর্ডার করা কিছু বই এসেছে, সেগুলো সংগ্রহ করতে। পুরো সময়টাতে কয়েকটি ছবি তুলেছি। সেগুলো দিয়ে দিলাম। আর আমার বই পাগল মা কিন্তু বই না কিনে থাকেন নি। ওনার পড়াশুনার গভীরতা দেখলে অনেকেই হা হয়ে যাবেন।

নিবিষ্ট মনে মা বই দেখছেন

আগামী কাল পহেলা বৈশাখ। এই ব্যস্ত নগরের নাগরিক উল্লাস মা’কে কতটুকু খুশি করতে পারবে জানি না। তবুও একটু চেষ্টা করতে ক্ষতি কী! আসছে নতুন বছর, প্রতিটি প্রসূনে, প্রতিটি কিশলয়ে, প্রতিটি সবুজে ভর করে নির্ভার নতুন সময় আসুক। নিজের ক্ষমতার সর্বচ্চটুকু দিয়ে এইবার একটু চেষ্টা করতে চাই। সবাই ভালো থাকুন। শুভ নববর্ষ।

**//** ধানমন্ডি, ঢাকা।

আগুন দেখেছি আমি

আমাদের গ্রামে বেশ কিছু গরীব প্রতিবেশী ছিল। শৈশবে মনটা এখনকার মতো ক্লাসি ছিল না, তাই বেশীরভাগ খেলার সাথীই ছিল গরিবদের বাচ্চাকাচ্চারা। কিছুদিন পরে সেই বাড়িগুলো অন্যত্র সরিয়ে ফেলল; তাদের অবস্থা একটু উন্নতি হয়েছে ততদিনে। উন্নতি মানেই নিজের অবস্থান একটু শক্ত করার চেষ্টা, নিজস্ব একটা পরিবেশ খুঁজে নেয়া। হুট করে অনেকগুলো খেলার সাথী কমে গেল। যদিও বর্তমান সময়ে সেই বাড়িগুলো যথেষ্ট কাছেই কিন্তু শৈশবে সেগুলোকেই মনে হতো কত না দূর! একা যেতে পারতাম না। সাথে সঙ্গীসাথী নিয়ে যেতে হতো। খেলা তবু থেমে থাকে নি। আমরা অপেক্ষা করতাম কখন সূর্যটা একটা হেলে পড়ে। যতক্ষণ খালি চোখে ফুটবল চোখে পড়ত, আমরা খেলতাম। কীসের নব্বই মিনিট আর কীসের হাফ টাইম! শরীর ছিল লিকলিকে। এখন চিন্তা করতে রূপকথার গল্প মনে হয়!

প্রতিবেশীদের তৈরি করা নতুন বাড়িতে একদিন আগুন লাগল। আগুন মানেই আতঙ্ক, আগুন মানেই ভয় কিন্তু এর আগে কখনো বাড়িতে আগুন লাগা দেখিনি। অনেক উত্তেজনা।  আমাদের বাড়ি থেকে সেই আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছিল। সময়টা ছিল খেলা শুরু হওয়ার সময়। এত উচ্চতায় আগুনের লকলকে শিখা আগে কখনও দেখা হয় নাই। ঘরগুলো ছিল খরের, পাটকাঠির; আগুনের বেড়ে ওঠা ছিল অবধারিত। কিন্তু সংগ্রামি মানুষেরা সেই আগুনকে আয়ত্বে নিয়ে এসেছিল দ্রুতই। ততক্ষণে পুড়ে সব শেষ। আমার মন খারাপ। উত্তেজনা নেই। তার থেকে বড় কথা খেলা নষ্ট হয়ে গেছে সেদিনের।

আগুন নিভে এলে খোঁজ পড়ল এক শিশুর। কোথাও সেই শিশুকে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ ঠিক ভষ্ম হয়ে যাওয়া ঘরে খুঁজতেও চাচ্ছে না। সবখানে খুঁজে না পেয়ে নিভন্ত আগুনের মাঝে খোঁজা শুরু হলো। শিশুটির কয়লা হয়ে যাওয়া শরীর বেড় করে আনা হলো ছাইভষ্ম থেকে। মনে আছে একটা বাঁশের মাথায় আড়াআড়ি করে আর একটা বাঁশ দিয়ে বেশ ফাঁদ তৈরি করে শরীরটা টেনে আনা হয়েছিল। আমার চোখের সামনে দিয়ে আসা প্রথম অঙ্গার হয়ে যাওয়া লাশ। প্রথম বিভৎস দেহ দর্শন।

শিশুটির নাম ছিল “আয় সুতি” এর মানে হল Let’s Sleep. আপাতভাবে বেশ অশ্লীল এবং আদিরসাত্মক একটি নাম। কুড়িগ্রামে বাচ্চাদের নামকরণের আগে এই রকম অদ্ভুত সব নাম দিতেন মূলত শিশুটির দাদা বা নানা। নাতি-নাতনীদের সাথে এইসব রসিকতা করা একধরনের গ্রামীণ মজা। আয়সুতি’র কয়লা হয়ে যাওয়া শরীর দেখে প্রথববারের মতো ভয়ে রাতে ঘুম হলো না। আমার বয়স তখন সম্ভবত ৭। সারারাত কাঁপতে কাঁপতে মা’কে জড়িয়ে ধরে ছিলাম।

যে আগুনের শিখা দেখে অনেক লাফালাফি করলাম, সেই আগুনের পরিনতি ঠিক আর ভালো লাগল না। সবার মাতম, পরাজিত মানুষের মুখ আর একধরণের ক্রোধ দেখে আমার শৈশবের পৃথিবীতে একটা বড় ধরণের দাগ তৈরি করল। সেটাই ছিল জীবনের প্রথম আগুনে সবকিছু পুড়তে দেখা। শিশুটির লাশ যখন টেনে আনা হচ্ছিল, গ্রামের সবাই এক সাথে চিৎকার করে উঠেছিল। সমবেত চিৎকারে ঠিক কার কাছে ক্রোধের সমন্বয় করেছিল, সেই বয়সে বুঝতে পারছিলাম না।

এরপর যতদিন গ্রামে ছিলাম, আয়সুতি’র মা’কে কখনো হাসতে দেখিনি। যতবার তার মুখের দিকে তাকিয়েছি, একটা কয়লা হয়ে যাওয়া বাচ্চার ছবি বারবার ফিরে এসেছে মনে।

পরিতোষ সেনের জিন্দাবাহার এবং অন্যান্য বইয়ে আগুনের অদ্ভুত কিছু বর্ণনা পড়েছি। আগুনের সৌন্দর্য নিয়ে বা ভালোবাসা নিয়ে এমন ভাবে আর কেউ মনে হয় লেখেননি। মানে আমার পড়া হয় নাই। এই বই পড়ার পর থেকে আগুনকে খুব আর কষ্টের মনে হতো না। আগুনের শক্তি বা আগুনের রূপের সাথে সেটাই ছিল প্রথম পরিচয়।

After Fire: Moghbazar Slum. 23 November, 2009.

ম্যাক্সিকান ফটোগ্রাফার বন্ধু কার্লোস কাজালিস সহ কুড়িগ্রামে গিয়েছিলাম ছবি তুলতে। বিষয় ছিল ক্লাইমেট চেঞ্জ। ছবি তুলে ঢাকায় ফিরে আসি ২৩ নভেম্বর, ২০০৯। ঢাকায় এসেই শুনি গতকাল ঘটে যাওয়া মগবাজার বস্তির আগুনের ভয়াবহতার খবর। বিলম্ব না করেই সরাসরি সেই স্পটে দু’জনেই হাজির। সেই দৃশ্য দেখে এলো মেলো হয়ে গেলাম। একটা বাড়িও অবশিষ্ট নেই। সব একেবারেই ছাই। বোঝার কোন উপায় নেই এখানে প্রায় ৫০০০ লোকের বাড়ি ছিল। আগুনের শক্তি দেখে একরকম বাকরুদ্ধ। অনেক ছবি তুলে বাসায় ফিরে এলাম। আসার সময় আমার আর কার্লোসের আর ঠিক কোন গল্প হয়ে ওঠে নি। বিষাদে ছেয়ে গেছে যতদূর যাই!

এরপর অনেক আগুনের খবর পড়েছি, দেখেছি। কিন্তু কত ভয়াবহ হতে পারে সেটা আর কল্পনা করতে সমস্যা হয় নি। এই যে কয়েকদিন আগে যখন বননীতে আগুন লাগল, ৯/১১ এর মতো মানুষজন সুপারম্যানের মতো পড়ে মরল, সব দেখলাম। কী করার আছে! আগুনের আবিষ্কার ছিল সভ্যতার প্রথম সূচনা। এই আগুন একই ভাবে অসভ্যতারও প্রথম জন্মদাতা।

Nusrat, My Sister

ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি আগুন নিয়ে খেলতে নেই। অথচ কেমন খেলার ছলেই নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হলো। আগুনের পুড়ে মারার এই চল এই উপমহাদেশে নতুন নয়। সেই সতীদাহের যুগ থেকে আমরা এটা এনজয় করেই এসেছি! কিন্তু সেই রাবণও নেই, নেই সেই লঙ্কাও। কেমন করে যেন মনটা সেই ছোটবেলায় দেখা কয়লা হয়ে যাওয়া বাচ্চাটার সাথে আটকে আছে। তাই বারবার নুসরাতের ছবিটা দেখছি। গভীর চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে থাকছি। মাত্র কয়েকটি দিন আগেও সেই চোখে স্বপ্ন ছিল, ভালোবাসা ছিল, মমতা ছিল। ২০১৯ সালে আমরা সেই মেয়েটিকে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছি। মাত্র দুই বছর পর আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি। খুব অদ্ভুত ভাবে, স্বাধীনভাবে এই লেখাটা লেখার সময় আমি কাঁদছি। এবং স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি পুরো দেশ কাঁদছে। সেই ছোটবেলায় যেমন করে গ্রামের সবাই একসাথে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল, সেই রকম।

নুসরাত সারা বাংলাদেশের কাছে, সারা পৃথিবীর কাছে বলেছিল এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। আমি এই কাজটা করব। আমার জায়গা থেকে খুব স্পষ্টভাবেই করব।

**//** ধানমন্ডি, ঢাকা।

নাজমা

Nazma in my study room.

এই বালিকার নাম নাজমা। আমার কনিষ্ঠ ভগিনী’র বাসার সহকারি। কিছুদিন আগে ঢাকায় এসেছে। কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চল থেকে তার আগমন। বয়স মাত্র ১২। কিন্তু জীবনবোধের জায়গায় অনেক বড়। এই বয়সে প্রতিদিন খোঁজ নেয় কত বছর কাজ করলে তার বিয়ে করার মতো টাকা জমবে। সে তার নিজের একটা সংসারের জন্য স্বপ্ন দেখে। ছবি তুলতে চাইলে যে হাসি টা দিল, এই ভেজালের শহরে সেটা হজম করার সামর্থ নাই আমার। 
বালিকার শহরের প্রতিটি বিষয়ে কৌতহল। স্বভাবসুলভ কৌতহলে কোন কিছুই নিস্তার নাই। প্রতিদিন গড়ে ৪০০০ টা প্রশ্ন আর সেই প্রশ্নে বোন আমার পুরা কাহিল। 
শেষ কবে এমন হাসি হেসেছেন?

**//** ধানমন্ডি, ঢাকা।

বিনিদ্র রাত

সারা রাত জেগে আছি। এখন ভোর হচ্ছে। অদ্ভুত এই শহরের দালানগুলো সিলুয়েট হয়ে আছে। অনেক মানুষ হয়তো এই সময়ে তার হাই ডাইনামিক রেঞ্জের চোখ দিয়ে দালান আর ভোরের নরম আলোকে পৃথক করার চেষ্টা করছে। আর আমি বিনিদ্র। 
যে বিনিদ্র সে নাকি স্বপ্ন দেখতে পারে না। কিন্তু স্বপ্নের অত্যাচারে কিছু মানুষ নিশাচর। আধুনিক ঘরে বসে, ইন্টারনেটে সারা দুনিয়া চরে বেড়ায়। এই পৌনে ৩৯ বছরের জীবনে এতো বেশী পরিবর্তনের মধ্যে পড়েছি যে নিজেকে আর চিনতে পারি না। আমার পুরো নিজেকে হারিয়ে খোঁজার মতো একটা বিষয় হয়ে গেছে।
গত দুই দিন থেকে মনে হচ্ছে কোথায় কী জানি নেই। এক ধরণের হাহাকার নিয়ে এপাশ-ওপাশ করছি। নিঃশব্দের নিশ্বাস টের পাচ্ছি। বড্ড এলোমেলো অবস্থা। যমপূরীর মতো, একটা কাকের ডাকও পাই না। এই শহরের কাকগুলো ধানমন্ডি পরিত্যাগ করেছে। 
ভোর হচ্ছে, সবাই জাগছে। প্রতিটি প্রাণ যার যার অস্তিত্বের সংগ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনেক পড়তে হবে এই ভেবে বাবা-মায়েরা সন্তানদের ভোরে উঠিয়ে দিচ্ছে। আবার কেউ হয়তো সবচেয়ে আরামে ঘুমের মধ্যে তেপান্তরের মাঠে ঘোড়ায় চড়ে রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে ব্যাস্ত। আমার শরীরের ভিতরের জীবাণুরা নতুন উদ্যেমে বাাঁচার জন্য রক্তকণিকাকে আক্রমণ করার কোন ফন্দিতে ব্যস্ত। 
ইদানিং ভাবনাগুলো খুব এলোমেলো। ঘন্টার পর ঘন্টা লিখতে ইচ্ছে করে। কে কী ভাবল বা ভাবল না, গুরুত্ব দিল কী দিল-না এই ভেবে যাচ্ছেতাই ভাবে লিখতে ইচ্ছে করছে। বয়স হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী নামের এই গ্রহের অনেকগুলো ঋতু পার করে কেমন যেন অচেনা হয়ে গেছি। 
কোন একদিন আমি ঠিক সব ছেড়ে চলে যাব। সভ্যতা নামের থিওরি যা কিছু দিয়েছে, সব ফেলে খালি পায়ে হেটে চলে যাব। ক্যালেন্ডার নেই, এপয়েন্টমেন্ট নেই, ফোন নেই, এসএমএস নেই, ফেইসবুক নেই, ইন্টারনেট নেই এবং কম্পিউটার নেই কোন খানে। শেষ কবে চাদের আলোয় ঘুমিয়েছি! 
বড় অস্থির লাগছে। ভোর হচ্ছে অথচ আগের মতো আর জাগছি না। এভাবেই সভ্য হওয়ার চেষ্টায় দিনে দিনে আমার মৃত্যু হচ্ছে।

**//** ধানমন্ডি, ঢাকা।