একটি বাসর এবং একটি সস্তা বাংলা সিনেমা কিংবা আর একটি বেলতলার গল্প

Featured

প্রথম পর্ব:

বেলতলা বিষয়ক আমার জ্ঞান ভালোই বলা চলে। নেড়া ছিলাম কিনা সন্দেহ আছে আমার তবে বেলতলার স্মৃতিগুলো মাথা নেড়া করার মতোই। এই গল্পের শুরুটা অনেক আগেই। প্রথম প্রেম বা বিয়ে সব কিছুর জন্য আমি এই বেলতলাকে নির্ভর করতে পারি।

আমার বিয়েটা হয়েছিল ২০০২ সালের ১০ডিসেম্বর। প্রায় ৫বছর প্রেম করার পর বিয়ে। এই বিয়ে টেকেনি। ৫বছর ঘর করার পরে ঘর ভেঙে যায়। ৫ নাকি ম্যাজিক নাম্বার! আমার জন্য কোন ম্যাজিক নয় বড়ং লজিক এলোমেলো করার মতোন একটা বিষয়। তাই ম্যাজিক বিষয়ক লজিক নিয়ে আর ভাবি না। এই বিয়ে বিষয়ক মাথা নেড়ার আগে থেকে একটা সিনেমা’র শুটিং শুরু হয়। যাকে বলে খাঁটি বাংলা সিনেমা। আমি সেই সিনেমার নায়ক।

কোন এক অদ্ভুত কারণে আমার পরিবার আমার প্রাক্তন স্ত্রীর পরিবারকে পছন্দ করতো না। পরে জেনেছিলাম এই অপছন্দের ইতিহাস নাকি অনেক পুরোনো, দাদাদের সময় থেকে (খাঁটি বাংলা সিনেমা)! আমরা যে বাসায় থাকতাম তার পাশের বাসাতেই আমার স্ত্রীরা থাকত। বাসাটা ছিল কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী। প্রথম দিনেই আমার মা বলে দিলেন ভুলেও যেন ওই বাসাস কারো সাথে না মিশি। স্বাভাবিক ভাবেই অনুসন্ধানী হই। এই ভাবে পরিচয় হয়ে যায় সেই বাড়ির সবচেয়ে ছোট্ট মেয়েটির সাথে। এরপর একটু খানি দেখা, একটু খানি ছোঁয়া। একটু চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা বা একটু ঘুরতে যাওয়া। বড় মধুর সেই দিনগুলি। প্রথম মাথা খারাপ হয়ে গেল এক বৃষ্টির দিনে। প্রচন্ড বৃষ্টিতে মেয়েটি লাফাচ্ছিল পাগলের মতোন। বড়ই মধুর দৃশ্য। প্রেমে পড়ার জন্য যথেষ্ট। পড়লামো। কারো উচ্ছাস বা দুষ্টমি যে প্রেমের উপাদান হ’তে পারে জানতাম না। নতুন করে নিজেকে দিয়ে জানলাম। আমার জীবনের সস্তা বাংলা সিনেমা শুরু হলো। চলতে থাকলো নিয়তির দিকে। যেহেতু সস্তার সিনেমা তাই নায়ক-নায়িকার সাথে ভিলেনও প্রয়োজন।

ভিলেন হিসেবে আবির্ভাব হলো মেয়ের বোনেরা, চাচারা। আমাদে আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। এই রকম বাড়ন্ত অবস্থায় একদিন এক রকম জোড় করেই বিয়ে দিয়ে দিল আমাদের। আমার বয়স তখন ২২বছর ৬মাস। আমার বিয়ের দিন সবাই কাঁদল। আমার বাবাকে জীবনের প্রথম সেদিন কাদতে দেখলাম। আমার বাবা। যাকে জানতাম একটা ভারী মূর্তির মতোন, কখনো টলে নি। তিনি কাদলেন। অঝরেই কাদলেন। আমার হৃদয়টা প্রথমবারের মোন হুহু করে উঠলো। তখনই মনে হলো খুব ভালো কাজ হচ্ছে না এটা।

আমি বিয়ে করতে গেলাম আমার ফুফুর বাড়ি থেকে। আমাকে আমার বাড়ি থেকে বেড় করে দেয়া হলো। একটা সার্ট গায়ে দিয়ে রওনা হলাম। সাথে আমার বাবার ম্যানেজার, আমার ফুফাতো ভাই, আমার চাচাতো ভাই এবং ফুফা। এর পরের ৩০মিনিটের মধ্যেই আমার বেলতলা অধ্যায় শেষ হলো। লুৎফর রহমান নির্ঝর বিবাহিত হয়ে গেলেন।

দ্বিতীয় পর্ব:

ডিসেম্বরের ১০তারিখে কুড়িগ্রামের শীত ভয়ঙ্কর। হাড় কাঁপানো শীত। আমি ফুপার বাসা থেকে যখন রেডি হচ্ছি আমার কাজিন বলল গোসল করতে। আমি বললাম এই শীতে গোসল করতে ইচ্ছা করছে না। সে ভয়ঙ্কর রেগে গেল। বাধ্য হয়ে প্রচন্ড ঠান্ডায় ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে হলো। অনেক কাল পরে ঠান্ডা পানিতে গোসল। অনেক আদরে বড় হয়েছিলাম। কখনো ঠান্ডা পানির অনুভূতি শীতকালে হয়নি। হয়ে গেল। অনাকাঙ্খিত বিয়ের কোন ভাব মাথায় নেই। মাথায় রয়ে গেল প্রচন্ড শীতের অনুভূতি। শীতল অবস্থা। আমাদের বিয়ের ট্রেডিশনাল পোশাক পাঞ্জাবি। আমি এটা সার্ট এবং জিন্স চাপিয়ে রওনা দিলাম। কোন কষ্ট হলো না। এই কষ্ট হলো ২০০৭ সালে।

২০০৭ সালে আমার বন্ধু এবং কলিগ অনিক রায়হানের বিয়েতে গেলাম। প্রথম বারের মতোন কোন বিয়েতে যাওয়া। আমি মোটামুটি মানের অসামাজিক মানুষ। কখনো কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া হয় না। ইচ্ছাও করেনা। মানুষ দেখতে আমার ভালো লাগে। কিন্তু এইসব অনুষ্ঠানে মানুষের বৈচিত্র কম। একি রকমের মানুষ। দেখতে ভালো লাগে না। আমার এই না ভালো লাগা মন নিয়ে আমি অনীকের গায়ে হলুদে গেলাম। অনেক মজার অনুষ্ঠান। গায়ে হলুদ যে এতো মজার প্রগ্রাম আমি জানতাম না। আমার কলিগ মৌলি বলল গায়ে হলুদই নাকি সবচেয়ে মজার অনুষ্ঠান বিয়েতে। সেদিনের সেই মন ভালো করার একটা দিনে হঠাৎ হুহু করে উঠলাম। আহারে! আমার জীবনে কোন গায়ে হলুদ হয় নি। আমার বৌয়ের জন্যও খারাপ লাগল। সে তো আমার মতোন এবনরমাল নয়। স্বাভাবিক একটা মানুষ! তার চাওয়া পাওয়ার মধ্যে নিশ্চই গায়ে হলুদ ছিল, বাসর ছিল!

ছবিটা আমার বিয়ের আগের। শুকনা ছিলাম অনেক!

আমার বাবার নাম নজরুল ইসলাম। কুড়িগ্রামে সবাই তাকে এক নামেই জানে: নজরুল চেয়ারম্যান। অনেক প্রভাবশালী একজন মানুষ। ভালো মানুষ। তার একমাত্র ছেলে আমি। সেই প্রভাবশালী, বিত্তবান পরিবারের একমাত্র ছেলে আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি তার ম্যানেজার আর কাজিনদের সাথে নিয়ে, মোটর সাইকেলে করে। এই বিষয়টা আমাকে ভাবায় নি! কিন্তু আমার মা প্রচন্ড কষ্ট পেলেন। মা অনেক কষ্টে বলেছিলেন “ওরা কি একটা পাঞ্জাবিও কিনে আনতে পারে নাই!” এই দুঃখে মা দীর্ঘকাল ওই ফুপুর বাড়িতে যান নাই। আমি এখন চিন্তা করি সেদিনটার কথা! বড় অস্থির একটা দিন ছিল! আমার জন্য অনুভূতিহীন, পরিবারের জন্য শোকের দিন! সেই শোকাহত পরিবারের কাছ থেকে পাঞ্জাবি আশা করাটা যে অযৌক্তিক এটা মা’কে বুঝাবে কে!

২০০২ এর ১০ ডিসেম্বর আমার বিয়ের পর পরই আমি ঢাকা চলে আসি। পর পর মানে তৎক্ষণাৎ। আমার বিবাহিতা স্ত্রীর সাথে আমাকে দেখা করতেও দেয়া হলো না। আমি ঢাকায় এসে বন্ধুদের বললাম বিয়ে করেছি। কেউ পাত্তা দিল না। পাত্তা দেয়ার কথা না। ওরা বাংলা সিনেমা দেখে না। বাংলা সিনেমা হজম করার সামর্থ ওদের নেই।

আমি হোস্টেলে থাকতাম। ওল্ড ডিওএইচএস, বনানী। আমার ইউনিভার্সিটির অনেকের সাথে। আমি বিবাহিত এই তথ্য কেউই পাত্তা দিল না। বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। তখন কুড়িগ্রামে কোন মোবাইলের নেউওয়ার্ক ছিল না। যোগাযোগের কোন বুদ্ধি নেই। মনি (আমার স্ত্রী’র নাম) রংপুরে। তার কলেজ খোলা। এর মধ্যে একদিন যোগাযোগ হলো। আর সাথে সাথে চলে গেলাম রংপুর। বিয়ের পর প্রথম বারের মতোন দেখা করতে যাচ্ছি নিজের বউয়ের সাথে। সময়টা ২০০৩ সালের জানুয়ারি।

অনেক ভোরে রংপুরে নামলাম। তারপর অপেক্ষা। একটু আলো ফোটার সাথে সাথেই মনি’র হোস্টেলে চলে যাই। “আলো ফোটা খুব ফোটা এক ফোটা ভোরে” কৃষ্ণকলির গান। যাবার একটু পরেই মনি আসে। ভোরের নরম আলো, নির্ঘুম ফোলা চোখ নিয়ে আমি মনির সামনে। মনি্রো চোখ ফোলা, সারারাত উত্তেজনায় ঘুমায় নি। আমার বয়স তখন ২২বছর ৬মাস আর মনি’র ২০। ওর হোস্টেলের ওয়েটিং রুমে দেখা। ওর সাথের অনেক মেয়ে আসল আমাকে দেখতে। পিচ্চি একটা বড় (আমার চেহারা থেকে এখনএ বাচ্চা বাচ্চা ভাব টা গেল না!)! আমি লাজুক ভাবেই সব মন্তব্য হজম করলাম।

আমার গায়ের সুয়েটারটি জার্নিতে নোংড়া হয়েছিল। মনি এটা ধু’তে নিয়ে গেল। এবং জীবনের প্রথম আমার কাপড় ধুতে গিয়ে বিড়াট একটা হাস্যকর ভুল করল। অতি উত্তেজনায় আমার সুয়েটার না ধুয়ে তার রূমমেটের টা ধুয়ে ফেলে আর সেই সুবাদে আমাকে সেই নোংড়াটাই পড়তে হয়েছিল।

আমরা সারাদিন রিকসায় ঘুরলাম। অনেক আত্মিয়’র বাড়িতে গেলাম। তারপর রাত কাটালাম একটা হোটেলে। পরের দিন আরো অ্যাডভানচারাস! আমরা চলে যাই দিনাজপুর, মনি’র খালার বাড়ির উদ্দেশ্যে। গিয়ে দেখা গেল তারা সবাই কুড়িগ্রামে। আবার ফেরত রংপুরে। সেখানে অপেক্ষা না করে আমরা আবার গাইবান্ধায় গেলাম। মনি’র আর এক খালার বাড়িতে। সেখানে আমরা ২দিন থেকে আবারও রংপুরে। এরপর আমার ভাই শাহীন চৌধুরী আমাদের তার বাসায় নিয়ে আসলেন। প্রথম বারের মতোন আন্তরিক উষ্ণ অভ্যর্থনা।

(চলবে……..)

রূপকথা আজকে ৯ বছর

মানুষের জন্মের প্রক্রিয়াটি বেশ মজার। পুরো অনিশ্চিয়তায় ভরা একটা সিনেমার নাম মানুষের জন্ম। একটা মাত্র শুক্রাণু সুযোগ পায় গর্ভধারণের প্রক্রিয়াতে। অথচ কয়েক লক্ষ্য শুক্রাণু অংশগ্রহণ করে সেই যাত্রায়। এই কয়েক লক্ষ্য শুক্রাণুর কয়েক লক্ষ্য সম্ভাবনা। একটির জায়গায় আর একটি হয়ে গেলে জন্ম নেয়া মানুষটির স্বভাব এবং চালচলনের পার্থক্য হয়ে যেত। এই অদ্ভুত অনিশ্চিয়তার খেলা শেষে মানব সন্তানেরা জন্ম নেয়। আমিও নিয়েছিলাম। আমার জন্ম সেই ১৯৮০ সালের ২১জুন, সকাল ১১:৫৫ মিনিটে, বাংলায় আষাঢ়ের ৭। বৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল কুড়িগ্রামের রাঙালীরবস গ্রামে। আমাদের বাড়ি ভারতের আসাম রাজ্যেই পাশেই। অথচ সেদিন ছিল গগন ফাঁটা রোদ। পিচঢালা পথ হলে নির্ঘাৎ জুতোর মধ্যে তা উঠে আসত। পিচের পথ সেই সময় ছিল না। কাদামাখা মেঠোপথ ধরে আমাদের আত্মীয়-স্বজনেরা জড়ো হয়েছিলেন আমার জন্মের স্বাক্ষী হতে।

অরুন্ধতী রূপকথা, আমার একমাত্র সন্তান

আমার জন্ম হলো একরকম মৃত অবস্থায়। আমার শ্বাসপ্রশ্বাস ছিল না কয়েক মিনিট ধরে। ড: মজিবর রহমান, এম.বি.বি.এস তখন রায়গঞ্জ হাসপাতালের ডাক্তার। ডাক্তারের প্রজ্ঞায় আমার আবার নিশ্বাস ফিরে আসে। আসলে এই ঘটনা আমার আত্মীয় স্বজনেরা যখন বলেন, তখন অনেক মজার হয়। জানতে পারি সেদিন ফুলকুমার নদী পার হতে গিয়ে কারা কারা পানিতে পরে গিয়েছিলেন। জানা যায় আমার দুই দাদী কেমন মাতম করে কাঁদছিলেন। আমার একমাত্র চাচা কেমন করে বাড়ির চারপাশে কাঁদতে কাঁদতে চক্রাকারে ঘুরছিলেন। এইসব গল্প আমার শৈশবে শোনা। ছোটবেলা থেকেই নিজেকে খুব স্পেশাল ভাবতে শিখেছি এই ঘটনা থেকেই।

আমার জন্মের কথা আয়োজন করে লিখলাম এতদিন পরে। জন্মের পর আমাকে দেখে আমার ডাক নাম রাখলেন আমার দাদী। সেই নাম হলো ননী। আমি ননীর মতোন ফর্সা ছিলাম। এমনকি সবাই ভাবত আমি কোন মানুষের বাচ্চাই না! এখনো আমার কিছু আত্মীয়-স্বজন আমাকে ননী নামে ডাকে। এমনকি স্কুলের বন্ধুরাও। কিন্তু এই নামটি একটা কারণে ঢাকা পরে গেল। আকিকাতে নাম রাখা হলো মো: লুৎফর রহমান। ডা: লুৎফর রহমানের সাথে মিল রেখে এই নাম রাখলেন আমার দাদাজান, খলিলুর রহমান ব্যাপারী। ব্যপারী আমাদের পারিবারিক নাম। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় সেন্টার পরীক্ষা নামের একটা পরীক্ষা ছিল ১৯৯০ সালে। সেই সার্টিফিকেটে আমার নাম মো: লুৎফর রহমান ব্যাপারী। এই নাম থেকে লুৎফর রহমান নির্ঝর হওয়ার গল্পটাও বেশ মজার। এই গল্পটা অনেক নারীবাদি একটা গল্প।

অজপারাগাঁ শব্দটা আমাদের গ্রামের জন্য প্রযোজ্য। প্রত্যন্ত অঞ্চল। কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জ ইউনিয়নের রাঙালীরবস গ্রামে। ছোটবেলায় যাতায়াতের জন্য ছিল মহিশের গাড়ি। মোটর সাইকেল ছিল বাবার। গ্রামের কাদামাখা রাস্তায় মোটারসাইকেল চালাতে হলে হতে হবে অনেক দক্ষ। মোটরসাইকেল পিছলে পরা ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। সেই গ্রামে বিয়ে করে আমার মা এলেন।

পূর্বপুরুষদের জমিদারি ব্যবসা নেই। কিন্তু জমিদারি প্রথা লোপ পাওয়ার পরেও অনেক জমি। এই জমিতে কী করতে হবে, সেই ধারণা অস্পষ্ট। তখনো ইরি ধানের প্রচলন হয় নি। সেই অস্থির সময়ে বাবা পারিবারের হাল ধরলেন এবং বিয়ে করলেন ১৯৭৯ সালের ২১শে জুলাই। মা তখন সরকারি চাকরি করেন। পরিবার পরিকল্পণা অধিদপ্তরের মাঠ সমন্বয় কর্মী। এখানে বলার অপেক্ষা রাখে না যে পুরুষতন্ত্র সেই সময়ে কতটা কঠিন ছিল।

একটা শিশুর জন্ম হলো। একটা মায়ের প্রথম সন্তান। অথচ সেই মায়ের সন্তানের কোন কিছুতে কিছু বলার অধিকার থাকল না। মুসলিম পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে নামকরণ থেকে সবকিছু অধিকার করলেন দাদাজান এবং দাদী। আমার নাম নিয়ে মায়ের ইচ্ছের কথাটা আমাকে শুনতে হলো আমার বয়স যখন ১৯ তখন। সালটা ১৯৯৯।

একদিন মা অনেক দুঃখ করে জানালেন এই পরিবারে তার কোন ইচ্ছেই কোনদিন পূরণ হয় নি। এমনকি নিজের বাচ্চার নামটা পর্যন্ত তিনি রাখতে পারেন নি। তখন তিনি জানালেন তার ছেলের নাম তিনি রাখতে চেয়েছিলেন নির্ঝর। শুধু ডাকনামটুকু। কথাগুলো বলতে গিয়ে মা কেঁদে ফেললেন। আর আমি! আমি তখন পুরোদস্তুর কবি। মানে কবিতা লিখি, কাধে শান্তিনিকেতন মার্কা ব্যাগ, পাঞ্জাবী। বেশ কায়দা করে চলি। অন্যরকম ব্যাপার। সেদিন মাকে বলেছিলাম তার দেয়া নামটাই আমি প্রতিষ্ঠিত করব। সত্যিকার অর্থে সেটাই ছিল আমার প্রথম নারীবাদি চর্চা।

আমার মা সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ বই পড়তে পছন্দ করেন তা শুনলে এবং দেখলে অনেকেই চোখ কপালে তুলে ফেলবেন। মায়ের পড়াশুনা করার এই অভ্যাস আমরা সবাই পেয়েছি। এমনকি আমার তিন বোন এবং মায়ের সাথে যখন আড্ডা দেই, বাইরের কেউ সেই আড্ডা বুঝতে পারবেন না। অনেকটা কোডেড ভাষা। বিভিন্ন বইয়ের ক্যারেক্টারের ভাষায় আমরা কথা বলি।

আজ ৫ ই নভেম্বর। আমার একমাত্র কন্যার জন্মদিন। আমার কন্যা অরুন্ধতী রূপকথার আজ ৯ বছর পূর্ণ হলো। আমার মেয়েকে নিয়ে অনেক গল্প করার কিছু নেই। কন্যা আমার সাথে থাকে না। তার মায়ের সাথে মালয়েশিয়ায় থাকে। আমি তাকে দেখেছিলাম তার ১০ মাস বয়সে। তার বন্ধুরা গোপনে ফেইসবুক থেকে ছবি চুরি করে পাঠায়। আমি তার ছবি, তার আঁকা-আঁকি নিয়ে থাকি। স্বার্থক মানব জনম!

নভেম্বর নামা

নভেম্বর মাস এখনো আসে নি। আসি আসি করছে। নভেম্বর মানেই নভেম্বর ৫। এই ৫ তারিখ আসছে ভাবলেই মনটা খারাপ হতে থাকে। নানাভাবে ভুলে থাকি কিন্তু একটা এলার্ম অলক্ষ্যে টিকটিক করে। ২০১০ সালে সেই দিন আমার মেয়ের জন্ম।

আমাকে যারা চেনেন, সবসময় ভুলে যান যে আমার প্রায় নয় বছর বয়সী একটা ফুটফুটে মেয়ে আছে। মেয়ের নাম রূপকথা। অরুন্ধতী রূপকথা। গত আট বছর আমার মেয়েকে দেখি নি। এটা একটা বেদনার মহাকাব্য।

ছবিটা আমার মেয়ের কালা করা। ৪ বছর বয়সের। তার মায়ে ফেসবুক থেকে চুরি করেছিলাম।

গত কয়েকদিন থেকেই ভাবছি নভেম্বরের লেখা। এটা একটা অবধারিত লেখা। ভাবছিলাম যেদিন রূপকথার সাথে দেখা হবে, কী বলব তাকে? কী গল্প করব? গল্প কী শুরু করব এই ভাবে “আমি যখন তোমার বয়সী ছিলাম!” দিয়ে।

আমি যখন ৯ বছর, তখন কুড়িগ্রাম তো অনেক সবুজ। আমাদের গ্রামটা তখনও অনেক বড়। এখনও আয়তনে আগের সমানই আছে, কিন্তু শৈশবের স্থান বরাবরেই অনেক উন্নত আর বিশাল। বয়সের ক্রমে সবকিছুকে ছোট করতে শিখি অথবা বলা যেতে পারে চিন্তার পরিসর ছোট হয়। নষ্ট সময়ের আক্ষেপ নিয়ে বেঁচে থাকা।

আমার ৯ বছরে আমি চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি। রায়গঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম। আমাদের স্কুলে সামনে বিশাল মাঠ ছিল। সেই মাঠ এখনও আছে। পড়ার ফাঁকে একটাই কাজ ছিল, ফুটবল নিয়ে মাঠে পড়ে থাকা। বর্তমানের এই পান্ডার মতো শরীর যারা দেখে অভ্যস্ত তাদের কল্পনাসীমাতে কখনই আসবে না যে একসময় আমি ফুটবলার ছিলাম। আশ্চর্যজনকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পর্যন্ত ফুটবলটাই খেলেছি। ক্রিকেট আমার প্রিয় খেলা কখনই ছিল না। একটা শৈশব ফুটবল নিয়ে ছুটেছি বললে একদম বাড়িয়ে বলা হবে না।

প্রতিদিন স্কুলে যেতাম। ফুটবল খেলা না হলে (শিক্ষকরা মাঝে মাঝে খেলতে দিতেন না) মেয়েেদর সাথে ছি, কুতকুতও খেলতাম। আসলে সেই বয়সে গ্রামের ছেলেমেয়েদের জেন্ডার সেন্স থাকত না। ছেলেমেয়েদের সাথে কত বিচিত্র খেলা যে খেলেছি সেটা লিখতে গেলে বড় একটা উপাখ্যান হয়ে যাবে।

স্কুল শেষে বাড়িতে ফিরে আবারও ফুটবল নিয়ে কাজ। আসলে আমাদের বিশাল পরিবারের সবাই ফুটবলার। আমার বাবা ফুটবলার ছিলেন, দাদাও ফুটবলার ছিলেন। আমার চাচাতো বাই রেজাউল দীর্ঘদিন মোহামেডানে খেলেছেন এবং বেশ কয়েকবছর সেই দলের ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেছেন। আর ছোটবেলায় সবাই একসাথে ফুটবল খেলেই বড় হয়েছি। পাড়ায় পাড়ায় ফুটবল হলে আমাদের সাথে খেলতে কারো আগ্রহ বিশেষ থাকত না। আমাদে ফুটবল দল মানেই আমাদে পরিবার। একদম পারিবারিক দল এবং সবাই জেলার অন্যতম বড় খেলোয়ার।

বিশেষ ঘটনা ঘটত বর্ষার শুরুতে। প্রথম বৃষ্টির সময় যখন আকাশ কালো হয়ে আসত এক দৌড়ে চলে যেতাম বাড়ির পিছনের শেষ সীমানায়, যেখানে অনেকটা প্রান্তরের মতো খোলা আকাশ, আকাশের নীচে সবুজে ছাওয়া খেত। খেতের শেষেই ফুলকুমার নদী। কালো মেঘের থমথমে ভাবের সাথে এক চিলতে আলো বেড় হতো শেষ সীমানায়। সেই অদ্ভুত ঘোর লাগা আলো আমার অতি প্রিয়। বাংলার প্রাকৃতিক রূপের যদি কোন তালিকা করি, প্রথম বর্ষনের আগের মূহুর্ত হবে আমার প্রথম প্রিয় বিষয়।

কুড়িগ্রামে বৃষ্টি হতো অবিরত। একবার বৃষ্টি শুরু হলে আর থামত না। দিনের পর দিন বৃষ্টি। বৃষ্টি হলে স্কুলে আর যেতাম না। যাওয়ার দরকারও ছিল না। নদীতে নতুন পানি, খালে পানি, পুকুর থৈথৈ করা। আর পানি মানেই মাছ। কত রকম উপায়ে যে মাছ ধরতে পারতাম! নিজের শৈশবের কথা চিন্তা করলে নিজেই আর বিশ্বাস করি না।

আমার সন্তান রূপকথাকে সত্যিকারের রূপকথা শোনাব। এখনকার বাচ্চাদের কাছে আমাদের শৈশবকে রূপকথার মতোই শোনাবে।

ফেইসবুক নেই

আমি যে সময়টা ইয়েলো ক্যাফেতে বসে থাকি, লিখি। লিখি উপন্যাসটি অথবা এলোমেলো ভাবনাগুলো। ফেইসবুক আমার এলোমেলো ভাবনার জায়গাটায় একদম মোক্ষম একটা মাধ্যম। সেই ২০০০ সাল থেকে নিজের ওয়েব সাইট মেইনটেইন করে যাচ্ছি। ব্যক্তিগত ওয়েব বিষয়টা শুরুতে এইরকম ব্লগের মতো ছিল না, কিন্তু এক রকম স্টাটিক ওয়েব দিয়েই আমি ব্লগ করতাম। তখনো ঠিক ওয়ার্ডপ্রেস জনপ্রিয় হয় নি। বিষয়টি একই সাথে ছিল শেখার এবং নিজের ডায়েরি রক্ষা করার।

ওয়েবসাইট বিষয়ক প্রাথমিক সকল গবেষনা নিজের ব্যক্তিগত সাইট করতে গিয়েই। ওয়ার্ডপ্রেসে সাইট সরিয়ে ফেলি ২০০৬ সালে। হাসিন হায়দার তখন আমার কলিগ। একদিন হাসিন বলল ব্যক্তিগত সাইটের জন্য ওয়ার্ডপ্রেস ভালো। তার পরামর্শে ওয়ার্ডপ্রেস এবং সেই থেকে এর ফ্যান। পরবর্তীতে আমার প্রায় সকল সাইটই ওয়ার্ডপ্রেসে বানানো।

গত ২ দিন থেকে আমার ফেইসবুক বন্ধ। এটার মেরামতের কাজ চলছে। আসলে অনেকটা সময় বেঁচে যাচ্ছে। প্রচুর সময় নষ্ট হতো ফেইসবুকে। তাই খুব বেশী চেষ্টাও করছি না এটা ঠিক করার।

**//** ধানমন্ডি, ঢাকা।

মায়ের সাথে চৈত্রসংক্রান্তি

মা বেড়াতে এসেছেন আমার সাথে পহেলা বৈশাখ কাটাবে বলে। সাথে নিয়ে এসেছে গাছের পাকা পেপে আর ঘরের মুরগি (আসলে মোরগ)। মোরগ রান্না করেই এনেছেন, আমার মাথায় ঢুকে গেছে যে ঢাকায় রান্না করলে সেই রান্নার আর বাড়ির রান্নার মতো মজার হয় না। খুব সকালে মা আসার পর দুপুর থেকে খেয়েই চলেছি। এক দিনে মোটামুটি আমার ওজন ২.৫ কেজি বেড়ে গেছে। কোন আফসোস নাই।

চৈত্রের শেষ দিবসে চারুকলা

আমরা ৪ ভাইবোন। আমি সবার বড় এবং একমাত্র ছেলে। ভাইবোনেরা মিলে অনেকবার মা’কে বলেছে ঢাকায় এসে থাকতে। কিন্তু আব্বা মারা যাওয়ার পর মা আরো বেশী ব্যস্তা হয়ে পড়েছেন। ঢাকায় আসার বিষয়ে অবশ্য কোন যুক্তিও দিতে পারি না। পৃথিবীর কোন পাগল ৫০ বিঘা আয়তনের বাড়ি ছেড়ে ঢাকার ২০০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে এসে থাকবে! তবুও মা আসে। আমি ঘ্যানঘ্যান করি, বোনেরা ঘ্যানঘ্যান করে।

ঢাকা বাতিঘরে মা। চৈতসংক্রান্তির দিন।

যেহেতু মা এসেছেন ঢাকার নববর্ষ দেখতে তাই বিকেলে বের হয়েছিলাম শাহবাগ এবং চারুকলায় যাওয়ার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল নুসরাতের জন্য সবার সাথে দাঁড়াতে। কিন্তু হঠাৎ এলো বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যেই মা, ইমন ভাই (Imtiaz Mahmood) সহ চারুকলার বকুল তলায় গাড়ি পার্ক করে বসে রইলাম। বৃষ্টি থামে না। মা’র অবশ্য সমস্যা হয় নি। বৃষ্টি পড়লেই তার মন ভালো হয়ে যায়। অনেকক্ষণ থাকার পর আমরা বাতিঘরে গেলাম। অর্ডার করা কিছু বই এসেছে, সেগুলো সংগ্রহ করতে। পুরো সময়টাতে কয়েকটি ছবি তুলেছি। সেগুলো দিয়ে দিলাম। আর আমার বই পাগল মা কিন্তু বই না কিনে থাকেন নি। ওনার পড়াশুনার গভীরতা দেখলে অনেকেই হা হয়ে যাবেন।

নিবিষ্ট মনে মা বই দেখছেন

আগামী কাল পহেলা বৈশাখ। এই ব্যস্ত নগরের নাগরিক উল্লাস মা’কে কতটুকু খুশি করতে পারবে জানি না। তবুও একটু চেষ্টা করতে ক্ষতি কী! আসছে নতুন বছর, প্রতিটি প্রসূনে, প্রতিটি কিশলয়ে, প্রতিটি সবুজে ভর করে নির্ভার নতুন সময় আসুক। নিজের ক্ষমতার সর্বচ্চটুকু দিয়ে এইবার একটু চেষ্টা করতে চাই। সবাই ভালো থাকুন। শুভ নববর্ষ।

**//** ধানমন্ডি, ঢাকা।