মায়ের সাথে চৈত্রসংক্রান্তি

মা বেড়াতে এসেছেন আমার সাথে পহেলা বৈশাখ কাটাবে বলে। সাথে নিয়ে এসেছে গাছের পাকা পেপে আর ঘরের মুরগি (আসলে মোরগ)। মোরগ রান্না করেই এনেছেন, আমার মাথায় ঢুকে গেছে যে ঢাকায় রান্না করলে সেই রান্নার আর বাড়ির রান্নার মতো মজার হয় না। খুব সকালে মা আসার পর দুপুর থেকে খেয়েই চলেছি। এক দিনে মোটামুটি আমার ওজন ২.৫ কেজি বেড়ে গেছে। কোন আফসোস নাই।

চৈত্রের শেষ দিবসে চারুকলা

আমরা ৪ ভাইবোন। আমি সবার বড় এবং একমাত্র ছেলে। ভাইবোনেরা মিলে অনেকবার মা’কে বলেছে ঢাকায় এসে থাকতে। কিন্তু আব্বা মারা যাওয়ার পর মা আরো বেশী ব্যস্তা হয়ে পড়েছেন। ঢাকায় আসার বিষয়ে অবশ্য কোন যুক্তিও দিতে পারি না। পৃথিবীর কোন পাগল ৫০ বিঘা আয়তনের বাড়ি ছেড়ে ঢাকার ২০০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে এসে থাকবে! তবুও মা আসে। আমি ঘ্যানঘ্যান করি, বোনেরা ঘ্যানঘ্যান করে।

ঢাকা বাতিঘরে মা। চৈতসংক্রান্তির দিন।

যেহেতু মা এসেছেন ঢাকার নববর্ষ দেখতে তাই বিকেলে বের হয়েছিলাম শাহবাগ এবং চারুকলায় যাওয়ার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল নুসরাতের জন্য সবার সাথে দাঁড়াতে। কিন্তু হঠাৎ এলো বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যেই মা, ইমন ভাই (Imtiaz Mahmood) সহ চারুকলার বকুল তলায় গাড়ি পার্ক করে বসে রইলাম। বৃষ্টি থামে না। মা’র অবশ্য সমস্যা হয় নি। বৃষ্টি পড়লেই তার মন ভালো হয়ে যায়। অনেকক্ষণ থাকার পর আমরা বাতিঘরে গেলাম। অর্ডার করা কিছু বই এসেছে, সেগুলো সংগ্রহ করতে। পুরো সময়টাতে কয়েকটি ছবি তুলেছি। সেগুলো দিয়ে দিলাম। আর আমার বই পাগল মা কিন্তু বই না কিনে থাকেন নি। ওনার পড়াশুনার গভীরতা দেখলে অনেকেই হা হয়ে যাবেন।

নিবিষ্ট মনে মা বই দেখছেন

আগামী কাল পহেলা বৈশাখ। এই ব্যস্ত নগরের নাগরিক উল্লাস মা’কে কতটুকু খুশি করতে পারবে জানি না। তবুও একটু চেষ্টা করতে ক্ষতি কী! আসছে নতুন বছর, প্রতিটি প্রসূনে, প্রতিটি কিশলয়ে, প্রতিটি সবুজে ভর করে নির্ভার নতুন সময় আসুক। নিজের ক্ষমতার সর্বচ্চটুকু দিয়ে এইবার একটু চেষ্টা করতে চাই। সবাই ভালো থাকুন। শুভ নববর্ষ।

**//** ধানমন্ডি, ঢাকা।

আগুন দেখেছি আমি

আমাদের গ্রামে বেশ কিছু গরীব প্রতিবেশী ছিল। শৈশবে মনটা এখনকার মতো ক্লাসি ছিল না, তাই বেশীরভাগ খেলার সাথীই ছিল গরিবদের বাচ্চাকাচ্চারা। কিছুদিন পরে সেই বাড়িগুলো অন্যত্র সরিয়ে ফেলল; তাদের অবস্থা একটু উন্নতি হয়েছে ততদিনে। উন্নতি মানেই নিজের অবস্থান একটু শক্ত করার চেষ্টা, নিজস্ব একটা পরিবেশ খুঁজে নেয়া। হুট করে অনেকগুলো খেলার সাথী কমে গেল। যদিও বর্তমান সময়ে সেই বাড়িগুলো যথেষ্ট কাছেই কিন্তু শৈশবে সেগুলোকেই মনে হতো কত না দূর! একা যেতে পারতাম না। সাথে সঙ্গীসাথী নিয়ে যেতে হতো। খেলা তবু থেমে থাকে নি। আমরা অপেক্ষা করতাম কখন সূর্যটা একটা হেলে পড়ে। যতক্ষণ খালি চোখে ফুটবল চোখে পড়ত, আমরা খেলতাম। কীসের নব্বই মিনিট আর কীসের হাফ টাইম! শরীর ছিল লিকলিকে। এখন চিন্তা করতে রূপকথার গল্প মনে হয়!

প্রতিবেশীদের তৈরি করা নতুন বাড়িতে একদিন আগুন লাগল। আগুন মানেই আতঙ্ক, আগুন মানেই ভয় কিন্তু এর আগে কখনো বাড়িতে আগুন লাগা দেখিনি। অনেক উত্তেজনা।  আমাদের বাড়ি থেকে সেই আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছিল। সময়টা ছিল খেলা শুরু হওয়ার সময়। এত উচ্চতায় আগুনের লকলকে শিখা আগে কখনও দেখা হয় নাই। ঘরগুলো ছিল খরের, পাটকাঠির; আগুনের বেড়ে ওঠা ছিল অবধারিত। কিন্তু সংগ্রামি মানুষেরা সেই আগুনকে আয়ত্বে নিয়ে এসেছিল দ্রুতই। ততক্ষণে পুড়ে সব শেষ। আমার মন খারাপ। উত্তেজনা নেই। তার থেকে বড় কথা খেলা নষ্ট হয়ে গেছে সেদিনের।

আগুন নিভে এলে খোঁজ পড়ল এক শিশুর। কোথাও সেই শিশুকে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ ঠিক ভষ্ম হয়ে যাওয়া ঘরে খুঁজতেও চাচ্ছে না। সবখানে খুঁজে না পেয়ে নিভন্ত আগুনের মাঝে খোঁজা শুরু হলো। শিশুটির কয়লা হয়ে যাওয়া শরীর বেড় করে আনা হলো ছাইভষ্ম থেকে। মনে আছে একটা বাঁশের মাথায় আড়াআড়ি করে আর একটা বাঁশ দিয়ে বেশ ফাঁদ তৈরি করে শরীরটা টেনে আনা হয়েছিল। আমার চোখের সামনে দিয়ে আসা প্রথম অঙ্গার হয়ে যাওয়া লাশ। প্রথম বিভৎস দেহ দর্শন।

শিশুটির নাম ছিল “আয় সুতি” এর মানে হল Let’s Sleep. আপাতভাবে বেশ অশ্লীল এবং আদিরসাত্মক একটি নাম। কুড়িগ্রামে বাচ্চাদের নামকরণের আগে এই রকম অদ্ভুত সব নাম দিতেন মূলত শিশুটির দাদা বা নানা। নাতি-নাতনীদের সাথে এইসব রসিকতা করা একধরনের গ্রামীণ মজা। আয়সুতি’র কয়লা হয়ে যাওয়া শরীর দেখে প্রথববারের মতো ভয়ে রাতে ঘুম হলো না। আমার বয়স তখন সম্ভবত ৭। সারারাত কাঁপতে কাঁপতে মা’কে জড়িয়ে ধরে ছিলাম।

যে আগুনের শিখা দেখে অনেক লাফালাফি করলাম, সেই আগুনের পরিনতি ঠিক আর ভালো লাগল না। সবার মাতম, পরাজিত মানুষের মুখ আর একধরণের ক্রোধ দেখে আমার শৈশবের পৃথিবীতে একটা বড় ধরণের দাগ তৈরি করল। সেটাই ছিল জীবনের প্রথম আগুনে সবকিছু পুড়তে দেখা। শিশুটির লাশ যখন টেনে আনা হচ্ছিল, গ্রামের সবাই এক সাথে চিৎকার করে উঠেছিল। সমবেত চিৎকারে ঠিক কার কাছে ক্রোধের সমন্বয় করেছিল, সেই বয়সে বুঝতে পারছিলাম না।

এরপর যতদিন গ্রামে ছিলাম, আয়সুতি’র মা’কে কখনো হাসতে দেখিনি। যতবার তার মুখের দিকে তাকিয়েছি, একটা কয়লা হয়ে যাওয়া বাচ্চার ছবি বারবার ফিরে এসেছে মনে।

পরিতোষ সেনের জিন্দাবাহার এবং অন্যান্য বইয়ে আগুনের অদ্ভুত কিছু বর্ণনা পড়েছি। আগুনের সৌন্দর্য নিয়ে বা ভালোবাসা নিয়ে এমন ভাবে আর কেউ মনে হয় লেখেননি। মানে আমার পড়া হয় নাই। এই বই পড়ার পর থেকে আগুনকে খুব আর কষ্টের মনে হতো না। আগুনের শক্তি বা আগুনের রূপের সাথে সেটাই ছিল প্রথম পরিচয়।

After Fire: Moghbazar Slum. 23 November, 2009.

ম্যাক্সিকান ফটোগ্রাফার বন্ধু কার্লোস কাজালিস সহ কুড়িগ্রামে গিয়েছিলাম ছবি তুলতে। বিষয় ছিল ক্লাইমেট চেঞ্জ। ছবি তুলে ঢাকায় ফিরে আসি ২৩ নভেম্বর, ২০০৯। ঢাকায় এসেই শুনি গতকাল ঘটে যাওয়া মগবাজার বস্তির আগুনের ভয়াবহতার খবর। বিলম্ব না করেই সরাসরি সেই স্পটে দু’জনেই হাজির। সেই দৃশ্য দেখে এলো মেলো হয়ে গেলাম। একটা বাড়িও অবশিষ্ট নেই। সব একেবারেই ছাই। বোঝার কোন উপায় নেই এখানে প্রায় ৫০০০ লোকের বাড়ি ছিল। আগুনের শক্তি দেখে একরকম বাকরুদ্ধ। অনেক ছবি তুলে বাসায় ফিরে এলাম। আসার সময় আমার আর কার্লোসের আর ঠিক কোন গল্প হয়ে ওঠে নি। বিষাদে ছেয়ে গেছে যতদূর যাই!

এরপর অনেক আগুনের খবর পড়েছি, দেখেছি। কিন্তু কত ভয়াবহ হতে পারে সেটা আর কল্পনা করতে সমস্যা হয় নি। এই যে কয়েকদিন আগে যখন বননীতে আগুন লাগল, ৯/১১ এর মতো মানুষজন সুপারম্যানের মতো পড়ে মরল, সব দেখলাম। কী করার আছে! আগুনের আবিষ্কার ছিল সভ্যতার প্রথম সূচনা। এই আগুন একই ভাবে অসভ্যতারও প্রথম জন্মদাতা।

Nusrat, My Sister

ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি আগুন নিয়ে খেলতে নেই। অথচ কেমন খেলার ছলেই নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হলো। আগুনের পুড়ে মারার এই চল এই উপমহাদেশে নতুন নয়। সেই সতীদাহের যুগ থেকে আমরা এটা এনজয় করেই এসেছি! কিন্তু সেই রাবণও নেই, নেই সেই লঙ্কাও। কেমন করে যেন মনটা সেই ছোটবেলায় দেখা কয়লা হয়ে যাওয়া বাচ্চাটার সাথে আটকে আছে। তাই বারবার নুসরাতের ছবিটা দেখছি। গভীর চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে থাকছি। মাত্র কয়েকটি দিন আগেও সেই চোখে স্বপ্ন ছিল, ভালোবাসা ছিল, মমতা ছিল। ২০১৯ সালে আমরা সেই মেয়েটিকে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছি। মাত্র দুই বছর পর আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি। খুব অদ্ভুত ভাবে, স্বাধীনভাবে এই লেখাটা লেখার সময় আমি কাঁদছি। এবং স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি পুরো দেশ কাঁদছে। সেই ছোটবেলায় যেমন করে গ্রামের সবাই একসাথে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল, সেই রকম।

নুসরাত সারা বাংলাদেশের কাছে, সারা পৃথিবীর কাছে বলেছিল এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। আমি এই কাজটা করব। আমার জায়গা থেকে খুব স্পষ্টভাবেই করব।

**//** ধানমন্ডি, ঢাকা।

নাজমা

Nazma in my study room.

এই বালিকার নাম নাজমা। আমার কনিষ্ঠ ভগিনী’র বাসার সহকারি। কিছুদিন আগে ঢাকায় এসেছে। কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চল থেকে তার আগমন। বয়স মাত্র ১২। কিন্তু জীবনবোধের জায়গায় অনেক বড়। এই বয়সে প্রতিদিন খোঁজ নেয় কত বছর কাজ করলে তার বিয়ে করার মতো টাকা জমবে। সে তার নিজের একটা সংসারের জন্য স্বপ্ন দেখে। ছবি তুলতে চাইলে যে হাসি টা দিল, এই ভেজালের শহরে সেটা হজম করার সামর্থ নাই আমার। 
বালিকার শহরের প্রতিটি বিষয়ে কৌতহল। স্বভাবসুলভ কৌতহলে কোন কিছুই নিস্তার নাই। প্রতিদিন গড়ে ৪০০০ টা প্রশ্ন আর সেই প্রশ্নে বোন আমার পুরা কাহিল। 
শেষ কবে এমন হাসি হেসেছেন?

**//** ধানমন্ডি, ঢাকা।

বিনিদ্র রাত

সারা রাত জেগে আছি। এখন ভোর হচ্ছে। অদ্ভুত এই শহরের দালানগুলো সিলুয়েট হয়ে আছে। অনেক মানুষ হয়তো এই সময়ে তার হাই ডাইনামিক রেঞ্জের চোখ দিয়ে দালান আর ভোরের নরম আলোকে পৃথক করার চেষ্টা করছে। আর আমি বিনিদ্র। 
যে বিনিদ্র সে নাকি স্বপ্ন দেখতে পারে না। কিন্তু স্বপ্নের অত্যাচারে কিছু মানুষ নিশাচর। আধুনিক ঘরে বসে, ইন্টারনেটে সারা দুনিয়া চরে বেড়ায়। এই পৌনে ৩৯ বছরের জীবনে এতো বেশী পরিবর্তনের মধ্যে পড়েছি যে নিজেকে আর চিনতে পারি না। আমার পুরো নিজেকে হারিয়ে খোঁজার মতো একটা বিষয় হয়ে গেছে।
গত দুই দিন থেকে মনে হচ্ছে কোথায় কী জানি নেই। এক ধরণের হাহাকার নিয়ে এপাশ-ওপাশ করছি। নিঃশব্দের নিশ্বাস টের পাচ্ছি। বড্ড এলোমেলো অবস্থা। যমপূরীর মতো, একটা কাকের ডাকও পাই না। এই শহরের কাকগুলো ধানমন্ডি পরিত্যাগ করেছে। 
ভোর হচ্ছে, সবাই জাগছে। প্রতিটি প্রাণ যার যার অস্তিত্বের সংগ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনেক পড়তে হবে এই ভেবে বাবা-মায়েরা সন্তানদের ভোরে উঠিয়ে দিচ্ছে। আবার কেউ হয়তো সবচেয়ে আরামে ঘুমের মধ্যে তেপান্তরের মাঠে ঘোড়ায় চড়ে রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে ব্যাস্ত। আমার শরীরের ভিতরের জীবাণুরা নতুন উদ্যেমে বাাঁচার জন্য রক্তকণিকাকে আক্রমণ করার কোন ফন্দিতে ব্যস্ত। 
ইদানিং ভাবনাগুলো খুব এলোমেলো। ঘন্টার পর ঘন্টা লিখতে ইচ্ছে করে। কে কী ভাবল বা ভাবল না, গুরুত্ব দিল কী দিল-না এই ভেবে যাচ্ছেতাই ভাবে লিখতে ইচ্ছে করছে। বয়স হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী নামের এই গ্রহের অনেকগুলো ঋতু পার করে কেমন যেন অচেনা হয়ে গেছি। 
কোন একদিন আমি ঠিক সব ছেড়ে চলে যাব। সভ্যতা নামের থিওরি যা কিছু দিয়েছে, সব ফেলে খালি পায়ে হেটে চলে যাব। ক্যালেন্ডার নেই, এপয়েন্টমেন্ট নেই, ফোন নেই, এসএমএস নেই, ফেইসবুক নেই, ইন্টারনেট নেই এবং কম্পিউটার নেই কোন খানে। শেষ কবে চাদের আলোয় ঘুমিয়েছি! 
বড় অস্থির লাগছে। ভোর হচ্ছে অথচ আগের মতো আর জাগছি না। এভাবেই সভ্য হওয়ার চেষ্টায় দিনে দিনে আমার মৃত্যু হচ্ছে।

**//** ধানমন্ডি, ঢাকা।

এই রাতে আমারে রক্ষা করো

আমার কাছের মানুষজন ভালো ভাবেই জানেন বব মার্লের প্রতি আমার ভালোবাসার কথা। খুব ছোট বেলায় কোন কিছু না ভেবে, না জেনেই শুধুমাত্র অদ্ভুত মিউজিকের জন্য ভালোবেসে ফেলেছিলাম অদ্ভুত চুলের ভদ্রলোককে। 
আমার জন্ম ১৯৮০ সালের ২১ শে জুন। সেই বছর একটা গান লেখা হয়েছিল, Redemption Song. আমি ঘরোয়া আড্ডায় সবসময় বলি সেই গানটা আমার জন্ম উপলক্ষে লেখা হয়েছিল। যদিও বিপ্লবী হতে পারি নাই। নিজের সাথে নিজের বিপ্লবটাও প্রায় অসমাপ্ত।
বব মার্লের একটা জনপ্রিয় গান No Woman No Cry. এই গানটার এতোদিন ভুল অর্থ করে এসেছিলাম। কিন্তু গতরাতে বন্ধু Simu Naser এই ভুলটা ভেঙে দিয়েছে। সিমু বলল ক্যারিবিয়ানরা নো শব্দটা আগে ব্যবহার করে। গানটার অর্থ আসলে ‘না, তুমি কেঁদ-না, রমনী।’ 
যাই হোক এখন বসে আছি ইয়েলো ক্যাফেতে। পাশে বিকট শব্দে একজন গায়িকা ‘লাগ যা গালে ফের’ গেয়ে যাচ্ছেন। বাইরে ঝর হচ্ছে। এই ঝরের রাতে, এই বিজাতীয় সঙ্গীত যন্ত্রণা দিচ্ছে। বেক্সিমকো গ্রুপ জোর করে এই সঙ্গীতের প্রতিদিনের আয়োজন করে কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, এটা নিয়ে ভাবছি। 
দিনে দিনে ঢাকা শহরটা একটা অন্তঃসারশূণ্য নগরে পরিণত হচ্ছে। পরিচয়হীন, দয়াহীন এবং আত্মসম্মানহীন একটা সংষ্কৃতিতে বাস করছি।

প্রিয় একটা গান শেয়ার করছি।

নৈতিকতার স্খলন দেখেও –
মানবতার পতন দেখেও-
নির্লজ্জ অলস ভাবে বইছ কেন?
সহস্র বরষার-
উন্মাদনার-
মন্ত্র দিয়ে- লক্ষজনেরে-
সবল সংগ্রামী, আর অগ্রগামী
করে তোলো না কেন?
বিস্তীর্ণ দুপারের, অসংখ্য মানুষের-
হাহাকার শুনেও,
নিঃশব্দে নীরবে- ও গঙ্গা তুমি-
গঙ্গা বইছ কেন?

জ্ঞানবিহীন নিরক্ষরের-
খাদ্যবিহীন নাগরিকের
নেতৃবিহীনতায় মৌন কেন?
সহস্র বরষার-
উন্মাদনার-
মন্ত্র দিয়ে- লক্ষজনেরে-
সবল সংগ্রামী, আর অগ্রগামী
করে তোলো না কেন?
বিস্তীর্ণ দুপারের, অসংখ্য মানুষের-
হাহাকার শুনেও,
নিঃশব্দে নীরবে- ও গঙ্গা তুমি-
গঙ্গা বইছ কেন?

বিস্তীর্ণ দুপারের, অসংখ্য মানুষের-
হাহাকার শুনেও,
নিঃশব্দে নীরবে- ও গঙ্গা তুমি-
গঙ্গা বইছ কেন?

ব্যক্তি যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিক,
সমষ্টি যদি, ব্যক্তিত্বরহিত,
তবে শিথিল সমাজকে ভাঙো না কেন?
সহস্র বরষার-
উন্মাদনার-
মন্ত্র দিয়ে- লক্ষজনেরে-
সবল সংগ্রামী, আর অগ্রগামী
করে তোলো না কেন?

স্রোতস্বিনী কেন নাহি বও?
তুমি নিশ্চয়ই জাহ্নবী নও
তাহলে, প্রেরণা দাও না কেন?
উন্মত্ত ধরার-
কুরুক্ষেত্রের-
শরশয্যাকে আলিঙ্গন করা-
লক্ষকোটি ভারতবাসীকে, জাগালে না কেন?
বিস্তীর্ণ দুপারের, অসংখ্য মানুষের-
হাহাকার শুনেও,
নিঃশব্দে নীরবে- ও গঙ্গা তুমি-
গঙ্গা বইছ কেন?

**//** ইয়েলো ক্যাফে, ধানমন্ডি, ঢাকা।

রূপকথার জন্মদিন

আজ রূপকথার জন্মদিন। আজ ৫ নভেম্বর। ২০১০ সালের রাত ১২:০৫ মিনিটে তার জন্ম। সেই দিন সন্ধ্যা থেকে সিমু নাসের, আসিফ এন্তাজ রবি আর আমি পান্থপথে আমার বাসায় আড্ডা দিচ্ছিলাম। আড্ডার মাঝে ফোন। তারপর হাসপাতালে ছুটে যাওয়া। যেতে যেতেই রূপকথার মা’কে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকিয়ে ফেলেছে। বাইরে অপেক্ষা করছি। একটু পরেই টাওয়ালে জড়িয়ে নিয়ে একজন নার্স রূপকথাকে নিয়ে এলেন। আমার কোলে দিলেন। আমার কোলে এসেই চোখ খুলে আমার মুখটাকে একজন স্ক্যানিং করে দেখল সে। আমি তখন কম্পমান। সে রূপের, সে দৃষ্টির কাছে এফোড়-ওফোড় হয়ে একরকম অবস।

সবুজ… শিল্পী: অরুন্ধতী রূপকথা

আমার এই গল্পের একটা ফাক আছে। রূপকথার মা আমার সাথে ছিলেন না। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কী মনে করে জানি আমাকে সংবাদটা দিয়েছিলেন। আর আমি! ইগোর কাছে পরাজিত একপিস মানব সন্তান।

রূপকথা এখন থাকে কুয়ালালুমপুরে। ওর মায়ের চাকুরি সেখানে। আমি অনেক চুরি করে ছলনা করে ওর মায়ের প্রোফাইল থেকে ছবি ঘাটি। সে মেয়ের ছবি দেয় না, কিন্তু মেয়ের কর্মগুলো থাকে। এই ছবিটা আমার মেয়ের আঁকা। সম্ভবত ওর ৭বছর+ বয়সের। আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম চিত্রকর্ম এটি। আমি অনেক কায়দা করেও একটা লাইন আঁকতে পারি না। আর আমার একমাত্র সন্তান আস্ত একটা ছবি এঁকে ফেলল! এই ছবির দিকে তাকিয়ে কতবার যে কেঁদেছি! 

আজ অরুন্ধতী রূপকথার জন্মদিন। আজ রূপকথা ৮ বছরের একটা শিল্পী। 
নয়ন ভরে দেখব বলেই চোখ জুড়ে পানি…