একটি বাসর এবং একটি সস্তা বাংলা সিনেমা কিংবা আর একটি বেলতলার গল্প

প্রথম পর্ব:

বেলতলা বিষয়ক আমার জ্ঞান ভালোই বলা চলে। নেড়া ছিলাম কিনা সন্দেহ আছে আমার তবে বেলতলার স্মৃতিগুলো মাথা নেড়া করার মতোই। এই গল্পের শুরুটা অনেক আগেই। প্রথম প্রেম বা বিয়ে সব কিছুর জন্য আমি এই বেলতলাকে নির্ভর করতে পারি।

আমার বিয়েটা হয়েছিল ২০০২ সালের ১০ডিসেম্বর। প্রায় ৫বছর প্রেম করার পর বিয়ে। এই বিয়ে টেকেনি। ৫বছর ঘর করার পরে ঘর ভেঙে যায়। ৫ নাকি ম্যাজিক নাম্বার! আমার জন্য কোন ম্যাজিক নয় বড়ং লজিক এলোমেলো করার মতোন একটা বিষয়। তাই ম্যাজিক বিষয়ক লজিক নিয়ে আর ভাবি না। এই বিয়ে বিষয়ক মাথা নেড়ার আগে থেকে একটা সিনেমা’র শুটিং শুরু হয়। যাকে বলে খাঁটি বাংলা সিনেমা। আমি সেই সিনেমার নায়ক।

কোন এক অদ্ভুত কারণে আমার পরিবার আমার প্রাক্তন স্ত্রীর পরিবারকে পছন্দ করতো না। পরে জেনেছিলাম এই অপছন্দের ইতিহাস নাকি অনেক পুরোনো, দাদাদের সময় থেকে (খাঁটি বাংলা সিনেমা)! আমরা যে বাসায় থাকতাম তার পাশের বাসাতেই আমার স্ত্রীরা থাকত। বাসাটা ছিল কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী। প্রথম দিনেই আমার মা বলে দিলেন ভুলেও যেন ওই বাসাস কারো সাথে না মিশি। স্বাভাবিক ভাবেই অনুসন্ধানী হই। এই ভাবে পরিচয় হয়ে যায় সেই বাড়ির সবচেয়ে ছোট্ট মেয়েটির সাথে। এরপর একটু খানি দেখা, একটু খানি ছোঁয়া। একটু চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা বা একটু ঘুরতে যাওয়া। বড় মধুর সেই দিনগুলি। প্রথম মাথা খারাপ হয়ে গেল এক বৃষ্টির দিনে। প্রচন্ড বৃষ্টিতে মেয়েটি লাফাচ্ছিল পাগলের মতোন। বড়ই মধুর দৃশ্য। প্রেমে পড়ার জন্য যথেষ্ট। পড়লামো। কারো উচ্ছাস বা দুষ্টমি যে প্রেমের উপাদান হ’তে পারে জানতাম না। নতুন করে নিজেকে দিয়ে জানলাম। আমার জীবনের সস্তা বাংলা সিনেমা শুরু হলো। চলতে থাকলো নিয়তির দিকে। যেহেতু সস্তার সিনেমা তাই নায়ক-নায়িকার সাথে ভিলেনও প্রয়োজন।

ভিলেন হিসেবে আবির্ভাব হলো মেয়ের বোনেরা, চাচারা। আমাদে আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। এই রকম বাড়ন্ত অবস্থায় একদিন এক রকম জোড় করেই বিয়ে দিয়ে দিল আমাদের। আমার বয়স তখন ২২বছর ৬মাস। আমার বিয়ের দিন সবাই কাঁদল। আমার বাবাকে জীবনের প্রথম সেদিন কাদতে দেখলাম। আমার বাবা। যাকে জানতাম একটা ভারী মূর্তির মতোন, কখনো টলে নি। তিনি কাদলেন। অঝরেই কাদলেন। আমার হৃদয়টা প্রথমবারের মোন হুহু করে উঠলো। তখনই মনে হলো খুব ভালো কাজ হচ্ছে না এটা।

আমি বিয়ে করতে গেলাম আমার ফুফুর বাড়ি থেকে। আমাকে আমার বাড়ি থেকে বেড় করে দেয়া হলো। একটা সার্ট গায়ে দিয়ে রওনা হলাম। সাথে আমার বাবার ম্যানেজার, আমার ফুফাতো ভাই, আমার চাচাতো ভাই এবং ফুফা। এর পরের ৩০মিনিটের মধ্যেই আমার বেলতলা অধ্যায় শেষ হলো। লুৎফর রহমান নির্ঝর বিবাহিত হয়ে গেলেন।

দ্বিতীয় পর্ব:

ডিসেম্বরের ১০তারিখে কুড়িগ্রামের শীত ভয়ঙ্কর। হাড় কাঁপানো শীত। আমি ফুপার বাসা থেকে যখন রেডি হচ্ছি আমার কাজিন বলল গোসল করতে। আমি বললাম এই শীতে গোসল করতে ইচ্ছা করছে না। সে ভয়ঙ্কর রেগে গেল। বাধ্য হয়ে প্রচন্ড ঠান্ডায় ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে হলো। অনেক কাল পরে ঠান্ডা পানিতে গোসল। অনেক আদরে বড় হয়েছিলাম। কখনো ঠান্ডা পানির অনুভূতি শীতকালে হয়নি। হয়ে গেল। অনাকাঙ্খিত বিয়ের কোন ভাব মাথায় নেই। মাথায় রয়ে গেল প্রচন্ড শীতের অনুভূতি। শীতল অবস্থা। আমাদের বিয়ের ট্রেডিশনাল পোশাক পাঞ্জাবি। আমি এটা সার্ট এবং জিন্স চাপিয়ে রওনা দিলাম। কোন কষ্ট হলো না। এই কষ্ট হলো ২০০৭ সালে।

২০০৭ সালে আমার বন্ধু এবং কলিগ অনিক রায়হানের বিয়েতে গেলাম। প্রথম বারের মতোন কোন বিয়েতে যাওয়া। আমি মোটামুটি মানের অসামাজিক মানুষ। কখনো কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া হয় না। ইচ্ছাও করেনা। মানুষ দেখতে আমার ভালো লাগে। কিন্তু এইসব অনুষ্ঠানে মানুষের বৈচিত্র কম। একি রকমের মানুষ। দেখতে ভালো লাগে না। আমার এই না ভালো লাগা মন নিয়ে আমি অনীকের গায়ে হলুদে গেলাম। অনেক মজার অনুষ্ঠান। গায়ে হলুদ যে এতো মজার প্রগ্রাম আমি জানতাম না। আমার কলিগ মৌলি বলল গায়ে হলুদই নাকি সবচেয়ে মজার অনুষ্ঠান বিয়েতে। সেদিনের সেই মন ভালো করার একটা দিনে হঠাৎ হুহু করে উঠলাম। আহারে! আমার জীবনে কোন গায়ে হলুদ হয় নি। আমার বৌয়ের জন্যও খারাপ লাগল। সে তো আমার মতোন এবনরমাল নয়। স্বাভাবিক একটা মানুষ! তার চাওয়া পাওয়ার মধ্যে নিশ্চই গায়ে হলুদ ছিল, বাসর ছিল!

ছবিটা আমার বিয়ের আগের। শুকনা ছিলাম অনেক!

আমার বাবার নাম নজরুল ইসলাম। কুড়িগ্রামে সবাই তাকে এক নামেই জানে: নজরুল চেয়ারম্যান। অনেক প্রভাবশালী একজন মানুষ। ভালো মানুষ। তার একমাত্র ছেলে আমি। সেই প্রভাবশালী, বিত্তবান পরিবারের একমাত্র ছেলে আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি তার ম্যানেজার আর কাজিনদের সাথে নিয়ে, মোটর সাইকেলে করে। এই বিষয়টা আমাকে ভাবায় নি! কিন্তু আমার মা প্রচন্ড কষ্ট পেলেন। মা অনেক কষ্টে বলেছিলেন “ওরা কি একটা পাঞ্জাবিও কিনে আনতে পারে নাই!” এই দুঃখে মা দীর্ঘকাল ওই ফুপুর বাড়িতে যান নাই। আমি এখন চিন্তা করি সেদিনটার কথা! বড় অস্থির একটা দিন ছিল! আমার জন্য অনুভূতিহীন, পরিবারের জন্য শোকের দিন! সেই শোকাহত পরিবারের কাছ থেকে পাঞ্জাবি আশা করাটা যে অযৌক্তিক এটা মা’কে বুঝাবে কে!

২০০২ এর ১০ ডিসেম্বর আমার বিয়ের পর পরই আমি ঢাকা চলে আসি। পর পর মানে তৎক্ষণাৎ। আমার বিবাহিতা স্ত্রীর সাথে আমাকে দেখা করতেও দেয়া হলো না। আমি ঢাকায় এসে বন্ধুদের বললাম বিয়ে করেছি। কেউ পাত্তা দিল না। পাত্তা দেয়ার কথা না। ওরা বাংলা সিনেমা দেখে না। বাংলা সিনেমা হজম করার সামর্থ ওদের নেই।

আমি হোস্টেলে থাকতাম। ওল্ড ডিওএইচএস, বনানী। আমার ইউনিভার্সিটির অনেকের সাথে। আমি বিবাহিত এই তথ্য কেউই পাত্তা দিল না। বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। তখন কুড়িগ্রামে কোন মোবাইলের নেউওয়ার্ক ছিল না। যোগাযোগের কোন বুদ্ধি নেই। মনি (আমার স্ত্রী’র নাম) রংপুরে। তার কলেজ খোলা। এর মধ্যে একদিন যোগাযোগ হলো। আর সাথে সাথে চলে গেলাম রংপুর। বিয়ের পর প্রথম বারের মতোন দেখা করতে যাচ্ছি নিজের বউয়ের সাথে। সময়টা ২০০৩ সালের জানুয়ারি।

অনেক ভোরে রংপুরে নামলাম। তারপর অপেক্ষা। একটু আলো ফোটার সাথে সাথেই মনি’র হোস্টেলে চলে যাই। “আলো ফোটা খুব ফোটা এক ফোটা ভোরে” কৃষ্ণকলির গান। যাবার একটু পরেই মনি আসে। ভোরের নরম আলো, নির্ঘুম ফোলা চোখ নিয়ে আমি মনির সামনে। মনি্রো চোখ ফোলা, সারারাত উত্তেজনায় ঘুমায় নি। আমার বয়স তখন ২২বছর ৬মাস আর মনি’র ২০। ওর হোস্টেলের ওয়েটিং রুমে দেখা। ওর সাথের অনেক মেয়ে আসল আমাকে দেখতে। পিচ্চি একটা বড় (আমার চেহারা থেকে এখনএ বাচ্চা বাচ্চা ভাব টা গেল না!)! আমি লাজুক ভাবেই সব মন্তব্য হজম করলাম।

আমার গায়ের সুয়েটারটি জার্নিতে নোংড়া হয়েছিল। মনি এটা ধু’তে নিয়ে গেল। এবং জীবনের প্রথম আমার কাপড় ধুতে গিয়ে বিড়াট একটা হাস্যকর ভুল করল। অতি উত্তেজনায় আমার সুয়েটার না ধুয়ে তার রূমমেটের টা ধুয়ে ফেলে আর সেই সুবাদে আমাকে সেই নোংড়াটাই পড়তে হয়েছিল।

আমরা সারাদিন রিকসায় ঘুরলাম। অনেক আত্মিয়’র বাড়িতে গেলাম। তারপর রাত কাটালাম একটা হোটেলে। পরের দিন আরো অ্যাডভানচারাস! আমরা চলে যাই দিনাজপুর, মনি’র খালার বাড়ির উদ্দেশ্যে। গিয়ে দেখা গেল তারা সবাই কুড়িগ্রামে। আবার ফেরত রংপুরে। সেখানে অপেক্ষা না করে আমরা আবার গাইবান্ধায় গেলাম। মনি’র আর এক খালার বাড়িতে। সেখানে আমরা ২দিন থেকে আবারও রংপুরে। এরপর আমার ভাই শাহীন চৌধুরী আমাদের তার বাসায় নিয়ে আসলেন। প্রথম বারের মতোন আন্তরিক উষ্ণ অভ্যর্থনা।

(চলবে……..)

One thought on “একটি বাসর এবং একটি সস্তা বাংলা সিনেমা কিংবা আর একটি বেলতলার গল্প

  1. ন্যাড়া বেলতলায় একবার নাকি পাঁচবার যায় এটা অন্য বিষয় কিন্তু আপনাকে আমরা ফুলতলায় আর একবার দেখতে চাই।।
    পরবর্তী লেখার জন্য অপেক্ষা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.