এলেবেলে

_MG_5506

নতুন বছর টা শুরু হয়ে গেল, যদিও বাংলায় দিন ক্ষনের হিসেব রাখা হয় না। বাংলা মনে হল ৮ই ফাল্গুন অথবা ৭ই আষাঢ়। একটা ২১শে ফেব্রুয়ারী অননটা ২১শে জুনে, আমার জন্মদিন। তারপরেও প্রততেকবার একটা করে পহেলা বৈশাখ আসে। নববর্ষের শুভেচ্ছা অনেক দেরি করে দেয়া হল। শুভ নববর্ষ। যদিও এবার অনেক তিক্তটা দিয়ে শুরু হল বছর। কেন?

বছর শুরু হবার আগে আগে হঠাত্‍ ফোন “তুই কী তাঞ্জিকা কে বিয়ে করেছিস?” আমি আকাশ থেকে পড়ে হূস পাই না। আমি কেন তঞ্জিকা কে বিয়ে করতে যাব। এর পরের ফোনটা আরও ভয়ংকর। “তর কী কোনো পর্ণ বের হইছে?” আমি বললাম “খাইছে আমারে”। আমার এত নাম হবার কোনও দরকার নাই। পড়ে জানতে পারলাম অনেকেই আমাকে এনামুল করিম নির্ঝর ভেবে ভুল করছেন। আমি বাধ্য হয়ে ফেসবুক এ বড় করে একটা স্টেটাস দিলাম যে আমি সেই নির্ঝর না। আমি আহা’র ডিরেক্টর না। বিশাল বিড়ম্বনা দিয়ে শেষ হল এই অধ্যায়। নির্ঝর নামের উপর একটু রাগ ও হল।

কলেজ পর্যন্ত আমার নাম নির্ঝর ছিল না। একদিন কথা প্রসঙ্গে মা বললেন তোর ডাক নাম নির্ঝর রেখেছিলাম। কিন্তু তোদের বাড়ির লোকদের ভয়ে আর বলতে পরী নাই। আমার তখন কেবল বেকটিততো তৈরি হচ্ছে অন্যরকম। মার সেই না পাওয়া ইচ্ছাকে পূরণ করে দিলাম। আমার নাম অফিসিয়াল্লী নির্ঝর করে দিলাম। এখন সবাই আমাকে এই নাম এ চেনে। কিন্তু এই নাম এনামুল করিম নির্ঝর নয়। লুত্‍ফর রহমান নির্ঝর।

বছরের প্রথম দিনে একটু পাগলামি করে ফেললাম। সারাদিন ঘাটাঘাটি করে একটা অনলাইন রেডিয়ো বানিয়ে ফেললাম। পুরা লাইভ। রাতে এটার টেস্ট রান করলাম। এবং বরাবরের মতন আমার এক ননটেক বন্ধু এটাকে বিশাল কিছু ভেবে বছরের সেরা সৃজনশীল প্রতিভাবান খেতাব দিয়ে দিলেন। যদিও মজার, তারপরেও অনেক ভাল লেগেছে।

বসন্ত আসে বসন্ত যায়। এবার একটা বসন্ত চলে গিয়ে আর একটা গ্রীষ্ম চলে এল। প্রথম দিন কিছুই করলাম না তেমন। সরদিন বাসায়। সবাই রঙ্গীন রঙ্গীন কাপড়ে হেটে চলছে, দেখা হল না। শুধু আমার মেয়েকে শুভেচ্ছা জানিয়ে স্কাইপ আপডেট দিয়েছি। এখনো আছে সেটা। শুভ নববর্ষ রূপকথা মা!

আমার উত্তর

ইদানিং ব্লগে লিখতে ইচ্ছা করে না। কী যে ইচ্ছা করে তাও আমি স্পষ্ট ভাবে জানি না। কোথায় জানি একটু করুন সুর, কোথাও জানি একটু একটু ব্যাথা। ওহে বেদনা আমার, তোমার সাথে আমার এখন শুধুই আনাগোনা।

ঢাকা-চেনা-অচেনা-মানুষ!

_MG_8511

প্রথম ঢাকা আসি কবে? মনে হয় ১৯৮৯ সালে। আমার কাজিনের বিয়ে হয়েছিল গাজীপুর, সেই উপলক্ষে ঢাকা ভ্রমণ। কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকা অনেক দূর। আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় ৪৬০ কিলোমিটার। পার হতে হতো যমুনা, ফেরিতে। মোট ১২ ঘন্টার পথ।

সেই সময়ের ঢাকা মানে চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক, জাদুঘর, এয়ারপোর্ট। মোটামুটি ভয়ংকর একটা বাসে করে ঢাকার যাত্রা শুরু হতো। পুরো রাস্তায় বমি, গরম! বিভীষিকাময় একটা ব্যাপার। তবুও ঢাকা। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। ঢাকা বুড়িগঙ্গা’র তীরে অবস্থিত।

প্রথম ঢাকা মানে গাজীপুর এসে পুরা একদিন ঘুম। ছোট শরীর, ঘুম তো আসবেই। পরের দিন শুরু হল সত্যিকারের ঢাকা দর্শন। গাজীপুর থেকে বাসে করে সোজা গুলিস্থান। সাথে আছেন আমার কাজিন। ওরা ঢাকায় অনেক দিন থেকে। ঢাকা ঢোকার পথে যেটা চোখে পড়েছিল তা হল মানুষ। পুরা শহর গিজগিজ করছে মানুষে (এখনকার মানুষের অর্ধের ছিল মনে হয় তখন, তাতেই সেই ধারনা)।

ওভার ব্রিজ এ চড়ে গাড়ি দেখেছিলাম। এত গাড়ি জীবনে এক সাথে দেখি নাই! জীবনের প্রথম সত্যিকারের ভাল আইসক্রীম খেলাম। অনেক তীব্র একটা অনুভুতি। আইসক্রীম আমার অনেক প্রিয় ছিল, এখনো আছে। তারপর একে একে চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, শিশুপার্ক দেখা শেষ করলাম। বেবী ট্যাক্সির ধোয়ায় চোখের অসহ্য জ্বালাপোড়া, এক দিনেই। সন্ধায় আবার গাজীপুর। অনেকটা স্বপ্নের মতন একটা অভিজ্ঞতা।

এর পরের বার ঢাকা আসি বাবা মার সাথে। বেড়াতে। ১৯৯০ সালে। গুলিস্থান এর হোটেল আল মনসুর এ হয় আমাদের ঠিকানা। গুলিস্থান মানেই লোকারণ্য। ঢাকার প্রাণকেন্দ্র। সেবার অনেক দিন ঢাকায় ছিলাম। অনেক ভাল একটা সময় কেটেছে।

এর পর ১৯৯৪ সালে হোলি চাইল্ড স্কুল এ পড়তে আসি। স্কুলটা ছিল উত্তরায়। আমার প্রায় আড়াই বছর সময় কাটে এখানে। ১৯৯৬ তে আবার কুড়িগ্রাম চলে যাই।

হোলি চাইল্ড এ ছিলাম হোস্টেল এ। বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন ভাষার ছাত্র সব। অনেক ধরনের মানসিকতার সাথে পরিচয় হল। অনেক বড় একটা অভিজ্ঞতা। আমার স্কুলের সেই বন্ধুদের সাথে এখনো আমার প্রানের সম্পর্ক। কম বয়সের বন্ধুরা সব। তখনও ঠিক স্বার্থপরতা শেখা হয়ে ওঠেনি। যেহেতু হোস্টেলে ছিলাম, বাইরের ঢাকাটা দেখা হয়ে ওঠেনি। ২০০০ সালে আবার ঢাকায় আসি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার উদ্দেশে।

আমার প্রথম ঠিকানা শুরু হয় কালাবাগান এ (আমার বর্তমান বাসার একদম পাশে)। আমার বয়স তখন ২০। একা একা চলে শুরু করেছি মাত্র। নিজের ভঙ্গিতে ঢাকা দেখা শুরু করলাম। শহরটার মজা বোঝা শুরু করেছিলাম। এই শহরের বিচিত্র মানুষ গুলন কে অনেক পছন্দ করে ফেললাম। এই মজার শহরে থাকার চিন্তা করে ফেললাম সেদিন থেকেই। এখনো রয়ে গেছি। কুড়িগ্রাম থেকে এসে ঢাকায়।

আস্তে আস্তে সময় যায়,আমিও ধীরে ধীরে বেড়ে উঠি। শহর টা আমাকে নিজের করে নেয়, আমিও। সহরটার যান্ত্রিকতা আস্তে আস্তে আমাকে যান্ত্রিক বানিয়ে ফেলল। জীবন যুদ্ধের শহর হয়ে গেল আমার।

সব মিলিয়ে প্রায় ১৪ বসর ঢাকায়। অনেক মানুষ দেখলাম। অনেক কিছুই শিখলাম। শহর আমাকে অনেক কিছু দিল, আমিও দিলাম। খুবই স্বার্থের একটা শহর। simple give and take.

happy morningগত পরশু আমার মনটা ভাল হয়ে গেল বসুন্ধরা শপিং মল এর সামনে। গাড়িতে বসে আছি জ্যাম এর কারণে। দেখি একটা মেয়ে হাতে একটা গোলাপ ফুল এবং সাথে একটা পেপার নিয়ে এল হাসি মুখের। ফুলের জন্য গ্লাস নামিয়ে নিলাম। জিজ্ঞেস করলাম কত? জবাবে কোনও দাম চাইল না। পড়ে বুঝলাম একটা হাসপাতালের  সার্ভিস প্রচার করার জন্য এই ব্যবস্থা! আমি কিন্তু অনেক খুশি। অনেক কাল পড়ে আমাকে কেউ একজন একটা ফুল দিল। আর তখনই এই ইট সিমেন্ট এর শহরটার যন্ত্র মানুষ গুলোকে ক্ষমা করে দিলাম। যারা একটা গ্রামের ছেলের মনটাকে অনেক যত্ন করে নষ্ট করে দিয়েছে। গোলাপ টা হাতে নিয়েই কাঁটার খোঁচা! রক্তাত্ত হলাম একটু। তবুও গোলাপ ফুটেছিল একটা, আমার জন্যে!

একটি বাসর এবং একটি সস্তা বাংলা সিনেমা কিংবা আর একটি বেলতলার গল্প

প্রথম পর্ব:

বেলতলা বিষয়ক আমার জ্ঞান ভালোই বলা চলে। নেড়া ছিলাম কিনা সন্দেহ আছে আমার তবে বেলতলার স্মৃতিগুলো মাথা নেড়া করার মতোই। এই গল্পের শুরুটা অনেক আগেই। প্রথম প্রেম বা বিয়ে সব কিছুর জন্য আমি এই বেলতলাকে নির্ভর করতে পারি।

আমার বিয়েটা হয়েছিল ২০০২ সালের ১০ডিসেম্বর। প্রায় ৫বছর প্রেম করার পর বিয়ে। এই বিয়ে টেকেনি। ৫বছর ঘর করার পরে ঘর ভেঙে যায়। ৫ নাকি ম্যাজিক নাম্বার! আমার জন্য কোন ম্যাজিক নয় বড়ং লজিক এলোমেলো করার মতোন একটা বিষয়। তাই ম্যাজিক বিষয়ক লজিক নিয়ে আর ভাবি না। এই বিয়ে বিষয়ক মাথা নেড়ার আগে থেকে একটা সিনেমা’র শুটিং শুরু হয়। যাকে বলে খাঁটি বাংলা সিনেমা। আমি সেই সিনেমার নায়ক।

কোন এক অদ্ভুত কারণে আমার পরিবার আমার প্রাক্তন স্ত্রীর পরিবারকে পছন্দ করতো না। পরে জেনেছিলাম এই অপছন্দের ইতিহাস নাকি অনেক পুরোনো, দাদাদের সময় থেকে (খাঁটি বাংলা সিনেমা)! আমরা যে বাসায় থাকতাম তার পাশের বাসাতেই আমার স্ত্রীরা থাকত। বাসাটা ছিল কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী। প্রথম দিনেই আমার মা বলে দিলেন ভুলেও যেন ওই বাসাস কারো সাথে না মিশি। স্বাভাবিক ভাবেই অনুসন্ধানী হই। এই ভাবে পরিচয় হয়ে যায় সেই বাড়ির সবচেয়ে ছোট্ট মেয়েটির সাথে। এরপর একটু খানি দেখা, একটু খানি ছোঁয়া। একটু চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা বা একটু ঘুরতে যাওয়া। বড় মধুর সেই দিনগুলি। প্রথম মাথা খারাপ হয়ে গেল এক বৃষ্টির দিনে। প্রচন্ড বৃষ্টিতে মেয়েটি লাফাচ্ছিল পাগলের মতোন। বড়ই মধুর দৃশ্য। প্রেমে পড়ার জন্য যথেষ্ট। পড়লামো। কারো উচ্ছাস বা দুষ্টমি যে প্রেমের উপাদান হ’তে পারে জানতাম না। নতুন করে নিজেকে দিয়ে জানলাম। আমার জীবনের সস্তা বাংলা সিনেমা শুরু হলো। চলতে থাকলো নিয়তির দিকে। যেহেতু সস্তার সিনেমা তাই নায়ক-নায়িকার সাথে ভিলেনও প্রয়োজন।

ভিলেন হিসেবে আবির্ভাব হলো মেয়ের বোনেরা, চাচারা। আমাদে আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। এই রকম বাড়ন্ত অবস্থায় একদিন এক রকম জোড় করেই বিয়ে দিয়ে দিল আমাদের। আমার বয়স তখন ২২বছর ৬মাস। আমার বিয়ের দিন সবাই কাঁদল। আমার বাবাকে জীবনের প্রথম সেদিন কাদতে দেখলাম। আমার বাবা। যাকে জানতাম একটা ভারী মূর্তির মতোন, কখনো টলে নি। তিনি কাদলেন। অঝরেই কাদলেন। আমার হৃদয়টা প্রথমবারের মোন হুহু করে উঠলো। তখনই মনে হলো খুব ভালো কাজ হচ্ছে না এটা।

আমি বিয়ে করতে গেলাম আমার ফুফুর বাড়ি থেকে। আমাকে আমার বাড়ি থেকে বেড় করে দেয়া হলো। একটা সার্ট গায়ে দিয়ে রওনা হলাম। সাথে আমার বাবার ম্যানেজার, আমার ফুফাতো ভাই, আমার চাচাতো ভাই এবং ফুফা। এর পরের ৩০মিনিটের মধ্যেই আমার বেলতলা অধ্যায় শেষ হলো। লুৎফর রহমান নির্ঝর বিবাহিত হয়ে গেলেন।

দ্বিতীয় পর্ব:

ডিসেম্বরের ১০তারিখে কুড়িগ্রামের শীত ভয়ঙ্কর। হাড় কাঁপানো শীত। আমি ফুপার বাসা থেকে যখন রেডি হচ্ছি আমার কাজিন বলল গোসল করতে। আমি বললাম এই শীতে গোসল করতে ইচ্ছা করছে না। সে ভয়ঙ্কর রেগে গেল। বাধ্য হয়ে প্রচন্ড ঠান্ডায় ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে হলো। অনেক কাল পরে ঠান্ডা পানিতে গোসল। অনেক আদরে বড় হয়েছিলাম। কখনো ঠান্ডা পানির অনুভূতি শীতকালে হয়নি। হয়ে গেল। অনাকাঙ্খিত বিয়ের কোন ভাব মাথায় নেই। মাথায় রয়ে গেল প্রচন্ড শীতের অনুভূতি। শীতল অবস্থা। আমাদের বিয়ের ট্রেডিশনাল পোশাক পাঞ্জাবি। আমি এটা সার্ট এবং জিন্স চাপিয়ে রওনা দিলাম। কোন কষ্ট হলো না। এই কষ্ট হলো ২০০৭ সালে।

২০০৭ সালে আমার বন্ধু এবং কলিগ অনিক রায়হানের বিয়েতে গেলাম। প্রথম বারের মতোন কোন বিয়েতে যাওয়া। আমি মোটামুটি মানের অসামাজিক মানুষ। কখনো কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া হয় না। ইচ্ছাও করেনা। মানুষ দেখতে আমার ভালো লাগে। কিন্তু এইসব অনুষ্ঠানে মানুষের বৈচিত্র কম। একি রকমের মানুষ। দেখতে ভালো লাগে না। আমার এই না ভালো লাগা মন নিয়ে আমি অনীকের গায়ে হলুদে গেলাম। অনেক মজার অনুষ্ঠান। গায়ে হলুদ যে এতো মজার প্রগ্রাম আমি জানতাম না। আমার কলিগ মৌলি বলল গায়ে হলুদই নাকি সবচেয়ে মজার অনুষ্ঠান বিয়েতে। সেদিনের সেই মন ভালো করার একটা দিনে হঠাৎ হুহু করে উঠলাম। আহারে! আমার জীবনে কোন গায়ে হলুদ হয় নি। আমার বৌয়ের জন্যও খারাপ লাগল। সে তো আমার মতোন এবনরমাল নয়। স্বাভাবিক একটা মানুষ! তার চাওয়া পাওয়ার মধ্যে নিশ্চই গায়ে হলুদ ছিল, বাসর ছিল!

ছবিটা আমার বিয়ের আগের। শুকনা ছিলাম অনেক!

আমার বাবার নাম নজরুল ইসলাম। কুড়িগ্রামে সবাই তাকে এক নামেই জানে: নজরুল চেয়ারম্যান। অনেক প্রভাবশালী একজন মানুষ। ভালো মানুষ। তার একমাত্র ছেলে আমি। সেই প্রভাবশালী, বিত্তবান পরিবারের একমাত্র ছেলে আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি তার ম্যানেজার আর কাজিনদের সাথে নিয়ে, মোটর সাইকেলে করে। এই বিষয়টা আমাকে ভাবায় নি! কিন্তু আমার মা প্রচন্ড কষ্ট পেলেন। মা অনেক কষ্টে বলেছিলেন “ওরা কি একটা পাঞ্জাবিও কিনে আনতে পারে নাই!” এই দুঃখে মা দীর্ঘকাল ওই ফুপুর বাড়িতে যান নাই। আমি এখন চিন্তা করি সেদিনটার কথা! বড় অস্থির একটা দিন ছিল! আমার জন্য অনুভূতিহীন, পরিবারের জন্য শোকের দিন! সেই শোকাহত পরিবারের কাছ থেকে পাঞ্জাবি আশা করাটা যে অযৌক্তিক এটা মা’কে বুঝাবে কে!

২০০২ এর ১০ ডিসেম্বর আমার বিয়ের পর পরই আমি ঢাকা চলে আসি। পর পর মানে তৎক্ষণাৎ। আমার বিবাহিতা স্ত্রীর সাথে আমাকে দেখা করতেও দেয়া হলো না। আমি ঢাকায় এসে বন্ধুদের বললাম বিয়ে করেছি। কেউ পাত্তা দিল না। পাত্তা দেয়ার কথা না। ওরা বাংলা সিনেমা দেখে না। বাংলা সিনেমা হজম করার সামর্থ ওদের নেই।

আমি হোস্টেলে থাকতাম। ওল্ড ডিওএইচএস, বনানী। আমার ইউনিভার্সিটির অনেকের সাথে। আমি বিবাহিত এই তথ্য কেউই পাত্তা দিল না। বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। তখন কুড়িগ্রামে কোন মোবাইলের নেউওয়ার্ক ছিল না। যোগাযোগের কোন বুদ্ধি নেই। মনি (আমার স্ত্রী’র নাম) রংপুরে। তার কলেজ খোলা। এর মধ্যে একদিন যোগাযোগ হলো। আর সাথে সাথে চলে গেলাম রংপুর। বিয়ের পর প্রথম বারের মতোন দেখা করতে যাচ্ছি নিজের বউয়ের সাথে। সময়টা ২০০৩ সালের জানুয়ারি।

অনেক ভোরে রংপুরে নামলাম। তারপর অপেক্ষা। একটু আলো ফোটার সাথে সাথেই মনি’র হোস্টেলে চলে যাই। “আলো ফোটা খুব ফোটা এক ফোটা ভোরে” কৃষ্ণকলির গান। যাবার একটু পরেই মনি আসে। ভোরের নরম আলো, নির্ঘুম ফোলা চোখ নিয়ে আমি মনির সামনে। মনি্রো চোখ ফোলা, সারারাত উত্তেজনায় ঘুমায় নি। আমার বয়স তখন ২২বছর ৬মাস আর মনি’র ২০। ওর হোস্টেলের ওয়েটিং রুমে দেখা। ওর সাথের অনেক মেয়ে আসল আমাকে দেখতে। পিচ্চি একটা বড় (আমার চেহারা থেকে এখনএ বাচ্চা বাচ্চা ভাব টা গেল না!)! আমি লাজুক ভাবেই সব মন্তব্য হজম করলাম।

আমার গায়ের সুয়েটারটি জার্নিতে নোংড়া হয়েছিল। মনি এটা ধু’তে নিয়ে গেল। এবং জীবনের প্রথম আমার কাপড় ধুতে গিয়ে বিড়াট একটা হাস্যকর ভুল করল। অতি উত্তেজনায় আমার সুয়েটার না ধুয়ে তার রূমমেটের টা ধুয়ে ফেলে আর সেই সুবাদে আমাকে সেই নোংড়াটাই পড়তে হয়েছিল।

আমরা সারাদিন রিকসায় ঘুরলাম। অনেক আত্মিয়’র বাড়িতে গেলাম। তারপর রাত কাটালাম একটা হোটেলে। পরের দিন আরো অ্যাডভানচারাস! আমরা চলে যাই দিনাজপুর, মনি’র খালার বাড়ির উদ্দেশ্যে। গিয়ে দেখা গেল তারা সবাই কুড়িগ্রামে। আবার ফেরত রংপুরে। সেখানে অপেক্ষা না করে আমরা আবার গাইবান্ধায় গেলাম। মনি’র আর এক খালার বাড়িতে। সেখানে আমরা ২দিন থেকে আবারও রংপুরে। এরপর আমার ভাই শাহীন চৌধুরী আমাদের তার বাসায় নিয়ে আসলেন। প্রথম বারের মতোন আন্তরিক উষ্ণ অভ্যর্থনা।

(চলবে……..)

টোপা পানা!

flamboyant

ছবিটা টোপা পানার। আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি তাদের কাছে অনেক পরিচিত এটি। অবশ্য ইদানিং এই জলজ উদ্ভিদ আর চোখে পড়ে না। কার্প জাতীয় কিছু মাছের দৌরাত্বে এগুলো ভালো জন্মায় না।

ছবিটা তুলেছিলাম সাভার এলাকা থেকে। একটা পুকুর থেকে। শ্যাওলাভরা একটা পুকুরের দেখা অনেক দিন পরে পেয়েছিলাম। সেই পুকুরের মধ্যে অনেকটা বিষন্ন হয়ে ছিল এই টোপা পানাটি। দলবল ছেড়ে একাকী!

ছবিটি তুলেছিলাম নাইকন ডি-৮০দিয়ে। লেন্স ব্যবহার করেছিলাম সম্ভবত ৩০০মিমি ম্যাক্র। অ্যাপারচার প্রায়রিটিতে।

আমি সবসময় র’তে ছবি তুলি। র প্রসেস করার জন্য ব্যবহার করেছি অ্যাডমি ক্যামেরা র ৪.৫।

অনেক আগের তোলা ছবি। বরাবরের মতোন এটি আমার ফ্লিকারে আপলোড করেছি। ছবিটা খুব ভালো মানের কিছু হয় নি। কিন্তু আমার স্মৃতি’র স্বার্থে রেখে দিলাম। আপনাদেরও ভালো লাগবে না। তবুও শেয়ার করলাম। সবাবইকে শুভেচ্ছা।

মৃত এবং জীবিতরা

dead vs live

এই ছবিটার নাম মৃত বনাম জীবিত। তুলেছিলাম কয়েক মাস আগে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে। আজকে ছবিটা আমার ফ্লিকারে পোস্ট করলাম। যেহেতু আমি এখন উপলক্ষ করছি ছবিটাকে তাই ছবির সাথে একাত্মতা করতেই হচ্ছে। এটা দায়বদ্ধতা এক ধরনের। ছবির প্রতি দায়ভার।

আমার বাড়ি কুড়িগ্রামের রায়গঞ্জে। বাড়ি যেতে পাড়ি দিতে হয় ধরলা নদী। আগে এই নদীর উপর ব্রিজ ছিল না। তখন অনেকটা পথ হেটে যেত হতো চরের মধ্য দিয়ে। অনেক কষ্টের একটা পথ। নদীর চরে সব সময় দু’জন ভিখারিনীকে বসে থাকে দেখতাম। কথনও কথা বলতো না। ফ্যাল ফ্যার করে চেয়ে থাকতো। ভাবলেশহীন (আমি তাদের সম্পর্কে আমার একটা কবিতা লিখব তে বলেছি) মুখ। আমি আজকে চিন্তা করছি তারা কী মৃতজন ছিলেন? তাদের জীবন বোধটা কী ছিল? জীবনের কোন দিকটা নিয়ে তারা ভাবিত হতেন?

অনেক নির্জনতায় আমার বাস এখন। একা একা থাকি। ভাবি। অনুভব করার চেষ্টা করি জীবনকে। এই নির্জনতায় মাঝে মাঝে নিজেকে মৃত মনে হয়। বা মৃতপ্রায়। এই অনুভবের প্রেক্ষিতে মাথায় এলো একটা সার্ভিসের কথা। এমন কোন একটা নাম্বার থাকবে। যে নাম্বারে ফোন করলে অটো এন্সার হবে। এবং যা থেকে শোনা যাবে লাইভ কোলাহল। যে সময়টা আমি অনেক নিঃসঙ্গ অনুভব করব। আমি সেই নাম্বারে ফোন করে কোলাহল শুনব। কোলাহলকে এখন জীবন মনে হয়। মানে আমার এই জীবনবোধের সাথে তুলনা করে।

এমন কোন নাম্বার কী আছে যেখানে ফোন করে মানুষের দুঃখগুলোন অটো ক্লিন করে ফেলা যাবে। ফোন করলেই অপারেটর বলবে "আপনার দুঃখ ডাউনলোড করা হচ্ছে। ক্লিন করতে সময় লাগবে ১০মিনিট। এই ১০ মিনিট আপনি চোখ বন্ধ করে দিগন্ত বিস্তৃত কাশফুলের মাঝে ছুটে বেড়ান। নদীর পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকুন কোনার কিনারায়। আকাশে মেঘের জন্মদিন। সেই মেঘের মধ্যে মেঘ হয়ে যান। তারপর মেঘ থেকে যখন বৃষ্টি হবে সেই বৃষ্টিতে ভিজুন। পানির প্রতিটি বিন্দুতে বয়ে বেড়ানো দুঃখ গুলোন মিশিয়ে দিন। তারপর ধুয়ে যাক। ধুয়ে যাক মুছে যাক বেদনার সকল স্তর।" এটা হবে হয়তো কোনদিন। যেদিন সামান্য হাসির কলোরবে জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে আমি নবজাতকের মতোন অনুভব করব জীবনকে। জীবনের ক্লেদ থাকবে না। এমনটা কবে হবে? কবে কোন ম্যাজিশিয়ান আমাকে আলিঙ্গণ করবে? অপেক্ষায় আচি কিন্তু!

জীবন যেমন অপেক্ষার একটা দায়ভার নিয়ে বয়ে যাই। মাঝে মাঝে হিসেব মিলাই। কিন্তু যে অংক বা হিসেব মেলাতে চেষ্টা করি তা থাকে স্বপ্নের জগতে। তাই বাস্তবের মাপকাঠি গুলোন আরালে থেকে অন্যকারোর কলকাঠি-ইশারায় ওলোট পালোট হয়ে যায়। তাই আর দুঃখের শেষ হয় না। তাই আমি একটা দুঃখের ফোন নাম্বার পেয়েছি। এই নাম্বারটায় ফোন করলে কেউ একজন ফোনটা ধরে। তার গলার স্বরে থাকে জীবনের তাবৎ অভিজ্ঞতা। কিন্তু আমার মতোন যারা স্বপ্ন বা ভালোবাসার কাঙাল তাদের জন্য করুণামিসৃত কোন কথা থাকে না। তাই সময়ের প্রতিটি হাসির ঝঙ্কার, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। আর তা হয়ে যায় হাহাকারের অট্টহাসি। সেই হাহাকারের আকারে বিকারে দুঃখের জন্ম হয় শুধু। অত:পর। আমি নির্ঝর সেই দুখের ধারায় অনেক বেশি দুঃখ সঞ্চয় করি। এভাবেই আমার দুঃখ প্রাপ্তি ঘটে।