নভেম্বর নামা

নভেম্বর মাস এখনো আসে নি। আসি আসি করছে। নভেম্বর মানেই নভেম্বর ৫। এই ৫ তারিখ আসছে ভাবলেই মনটা খারাপ হতে থাকে। নানাভাবে ভুলে থাকি কিন্তু একটা এলার্ম অলক্ষ্যে টিকটিক করে। ২০১০ সালে সেই দিন আমার মেয়ের জন্ম।

আমাকে যারা চেনেন, সবসময় ভুলে যান যে আমার প্রায় নয় বছর বয়সী একটা ফুটফুটে মেয়ে আছে। মেয়ের নাম রূপকথা। অরুন্ধতী রূপকথা। গত আট বছর আমার মেয়েকে দেখি নি। এটা একটা বেদনার মহাকাব্য।

ছবিটা আমার মেয়ের কালা করা। ৪ বছর বয়সের। তার মায়ে ফেসবুক থেকে চুরি করেছিলাম।

গত কয়েকদিন থেকেই ভাবছি নভেম্বরের লেখা। এটা একটা অবধারিত লেখা। ভাবছিলাম যেদিন রূপকথার সাথে দেখা হবে, কী বলব তাকে? কী গল্প করব? গল্প কী শুরু করব এই ভাবে “আমি যখন তোমার বয়সী ছিলাম!” দিয়ে।

আমি যখন ৯ বছর, তখন কুড়িগ্রাম তো অনেক সবুজ। আমাদের গ্রামটা তখনও অনেক বড়। এখনও আয়তনে আগের সমানই আছে, কিন্তু শৈশবের স্থান বরাবরেই অনেক উন্নত আর বিশাল। বয়সের ক্রমে সবকিছুকে ছোট করতে শিখি অথবা বলা যেতে পারে চিন্তার পরিসর ছোট হয়। নষ্ট সময়ের আক্ষেপ নিয়ে বেঁচে থাকা।

আমার ৯ বছরে আমি চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি। রায়গঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম। আমাদের স্কুলে সামনে বিশাল মাঠ ছিল। সেই মাঠ এখনও আছে। পড়ার ফাঁকে একটাই কাজ ছিল, ফুটবল নিয়ে মাঠে পড়ে থাকা। বর্তমানের এই পান্ডার মতো শরীর যারা দেখে অভ্যস্ত তাদের কল্পনাসীমাতে কখনই আসবে না যে একসময় আমি ফুটবলার ছিলাম। আশ্চর্যজনকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পর্যন্ত ফুটবলটাই খেলেছি। ক্রিকেট আমার প্রিয় খেলা কখনই ছিল না। একটা শৈশব ফুটবল নিয়ে ছুটেছি বললে একদম বাড়িয়ে বলা হবে না।

প্রতিদিন স্কুলে যেতাম। ফুটবল খেলা না হলে (শিক্ষকরা মাঝে মাঝে খেলতে দিতেন না) মেয়েেদর সাথে ছি, কুতকুতও খেলতাম। আসলে সেই বয়সে গ্রামের ছেলেমেয়েদের জেন্ডার সেন্স থাকত না। ছেলেমেয়েদের সাথে কত বিচিত্র খেলা যে খেলেছি সেটা লিখতে গেলে বড় একটা উপাখ্যান হয়ে যাবে।

স্কুল শেষে বাড়িতে ফিরে আবারও ফুটবল নিয়ে কাজ। আসলে আমাদের বিশাল পরিবারের সবাই ফুটবলার। আমার বাবা ফুটবলার ছিলেন, দাদাও ফুটবলার ছিলেন। আমার চাচাতো বাই রেজাউল দীর্ঘদিন মোহামেডানে খেলেছেন এবং বেশ কয়েকবছর সেই দলের ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেছেন। আর ছোটবেলায় সবাই একসাথে ফুটবল খেলেই বড় হয়েছি। পাড়ায় পাড়ায় ফুটবল হলে আমাদের সাথে খেলতে কারো আগ্রহ বিশেষ থাকত না। আমাদে ফুটবল দল মানেই আমাদে পরিবার। একদম পারিবারিক দল এবং সবাই জেলার অন্যতম বড় খেলোয়ার।

বিশেষ ঘটনা ঘটত বর্ষার শুরুতে। প্রথম বৃষ্টির সময় যখন আকাশ কালো হয়ে আসত এক দৌড়ে চলে যেতাম বাড়ির পিছনের শেষ সীমানায়, যেখানে অনেকটা প্রান্তরের মতো খোলা আকাশ, আকাশের নীচে সবুজে ছাওয়া খেত। খেতের শেষেই ফুলকুমার নদী। কালো মেঘের থমথমে ভাবের সাথে এক চিলতে আলো বেড় হতো শেষ সীমানায়। সেই অদ্ভুত ঘোর লাগা আলো আমার অতি প্রিয়। বাংলার প্রাকৃতিক রূপের যদি কোন তালিকা করি, প্রথম বর্ষনের আগের মূহুর্ত হবে আমার প্রথম প্রিয় বিষয়।

কুড়িগ্রামে বৃষ্টি হতো অবিরত। একবার বৃষ্টি শুরু হলে আর থামত না। দিনের পর দিন বৃষ্টি। বৃষ্টি হলে স্কুলে আর যেতাম না। যাওয়ার দরকারও ছিল না। নদীতে নতুন পানি, খালে পানি, পুকুর থৈথৈ করা। আর পানি মানেই মাছ। কত রকম উপায়ে যে মাছ ধরতে পারতাম! নিজের শৈশবের কথা চিন্তা করলে নিজেই আর বিশ্বাস করি না।

আমার সন্তান রূপকথাকে সত্যিকারের রূপকথা শোনাব। এখনকার বাচ্চাদের কাছে আমাদের শৈশবকে রূপকথার মতোই শোনাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.